প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তির ওপর এ ধরনের হামলাকে সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ এই দুটি পত্রিকার ওপর হামলা।
সোমবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে সম্পাদক পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক যৌথ প্রতিবাদ সভায় এসব দাবি ও উদ্বেগ উঠে আসে। সভাটি পরিণত হয় সাংবাদিক সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক সম্মিলিত প্রতিবাদমঞ্চে, যেখানে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

সভায় সংহতি জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সরাসরি গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত। তার ভাষায়, “যে দেশে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নিরাপদ নয়, সে দেশে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকতে পারে না।” তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক চেতনা ও আশা জেগে উঠেছিল, এই হামলা সেই আন্দোলনের চেতনার বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, দেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকার সময় পার করেছে এবং এখন মানুষ আলোতে ফেরার প্রত্যাশা করছে। কিন্তু মব ভায়োলেন্স ও সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ সেই প্রত্যাবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সব ধরনের চক্রান্ত ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, বাংলাদেশে অতীতেও সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবারই এসব হামলা রাষ্ট্রের জন্য একটি অশনিসংকেত হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করতে হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, তারাই এ ধরনের সহিংসতার পথ বেছে নেয়। তিনি সব ধরনের হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ সভায় বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা কেবল দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজকে ভয় দেখানোর একটি চেষ্টা। তারা বলেন, যখন কোনো গোষ্ঠী বা দল আইনের পথ এড়িয়ে মব তৈরি করে হামলায় নামে, তখন সেটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। আইনের শাসন কার্যকর থাকলে কেউ এমন সাহস দেখাতে পারে না।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য ও ঘৃণাভাষার বিস্তার মব ভায়োলেন্সের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সভায় উপস্থিত মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, এ ধরনের ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা না হলে আন্তর্জাতিক মহলেও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, মব ভায়োলেন্স শুধু সাংবাদিক বা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। আজ যদি পত্রিকার ওপর হামলা হয় এবং তার বিচার না হয়, কাল একই সহিংসতা অন্য যে কারও ওপর নেমে আসতে পারে। তাই এটি একটি সামষ্টিক সমস্যা, যার সমাধানে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজকে একসঙ্গে এগোতে হবে।

সভায় ব্যবসায়ী নেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ গণমাধ্যম পরিবেশ ছাড়া বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ বিনিয়োগবান্ধব থাকে না। ফলে এই হামলার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক বা সাংবাদিক মহলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জুলাই আন্দোলনের পর গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সভা থেকে বক্তারা সরকারের প্রতি স্পষ্ট আহ্বান জানান, এই হামলার ঘটনা যেন কোনোভাবেই ধামাচাপা না দেওয়া হয়। দোষীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যাই হোক না কেন, আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের তাগিদ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, সম্পাদক পরিষদের এই যৌথ প্রতিবাদ সভা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর আঘাত। এই আঘাতের জবাব যদি সময়মতো ও দৃঢ়ভাবে না দেওয়া হয়, তবে তা শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, পুরো জাতিকেই তার মূল্য দিতে হবে।