প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র হজ পালনে ইচ্ছুক ২০২৬ সালের হজযাত্রীদের জন্য হজ প্যাকেজের অবশিষ্ট অর্থ জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় মাধ্যমে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করা হজযাত্রীদের আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচিত হজ প্যাকেজের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি টাকা জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীর হজে গমন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
সোমবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ-১ শাখা থেকে জারি করা এক সরকারি চিঠিতে এই নির্দেশনার কথা জানানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের হজের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক নিবন্ধন কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং নিবন্ধনের সময় প্রত্যেক হজযাত্রী তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। হজ প্যাকেজ ও গাইডলাইন ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্যাকেজ মূল্যের পুরো অর্থ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার ফলে দেশের লাখো নিবন্ধিত হজযাত্রীর মধ্যে নতুন করে তৎপরতা দেখা দিয়েছে। অনেক হজযাত্রী ও তাদের পরিবার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। কারণ, দীর্ঘদিনের সাধনা ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পথে অর্থ পরিশোধে সামান্য বিলম্বও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, হজ ব্যবস্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক ও সময়নির্ভর প্রক্রিয়া। সৌদি আরব সরকারের সঙ্গে চুক্তি, আবাসন ব্যবস্থা, পরিবহন, খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সেবা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে যেসব হজযাত্রী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো টাকা জমা দেবেন না, তাদের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এর ফলে ওইসব হজযাত্রীর হজে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে।
হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে অনেক নিবন্ধিত হজযাত্রী শেষ মুহূর্তে সমস্যায় পড়েছেন। কখনো ফ্লাইট বুকিং, কখনো আবাসন বরাদ্দ, আবার কখনো ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে এবার আগেভাগেই সময়সীমা নির্ধারণ করে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হজ প্যাকেজের পুরো টাকা সময়মতো জমা হলে সরকারের পক্ষে সৌদি আরবে প্রয়োজনীয় অর্থ স্থানান্তর সহজ হয় এবং হজযাত্রীদের জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, “হজ একটি ইবাদত হলেও এর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এখানে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা বিলম্ব পুরো প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।”
সরকারি মাধ্যমে নিবন্ধিত হজযাত্রীদের পাশাপাশি বেসরকারি হজ এজেন্সির মাধ্যমে নিবন্ধনকারীদের জন্যও একই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, বেসরকারি এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব থাকবে তাদের অধীনে নিবন্ধিত হজযাত্রীদের সময়মতো অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করা।
এদিকে অনেক নিবন্ধিত হজযাত্রী জানিয়েছেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ব্যক্তিগত আর্থিক চাপে পড়েও তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা জমা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষায়, হজ জীবনের একবারের ইবাদত এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকার করতে তারা প্রস্তুত। তবে কেউ কেউ সরকারের কাছে কিস্তিতে পরিশোধ বা সময়সীমা কিছুটা বাড়ানোর অনুরোধও জানিয়েছেন।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হজ ব্যবস্থাপনা সৌদি সরকারের নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়। ফলে সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ খুবই সীমিত। তবে কোনো হজযাত্রী প্রকৃতপক্ষে সমস্যার সম্মুখীন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও হজ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো অর্থ পরিশোধ শুধু প্রশাসনিক শর্ত নয়, বরং হজযাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টাকা জমা হলে ফ্লাইট, আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হয় এবং শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি কমে আসে।
হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা বাড়লেও অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এখনো বড় সমস্যা। তিনি বলেন, “অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় শেষ মুহূর্ত বলে কিছু নেই। সময়মতো অর্থ জমা না দিলে পুরো পরিকল্পনাই ভেঙে পড়তে পারে।”

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই সরকারের সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে সমর্থন জানাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, সাধারণ মানুষের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আরও সহানুভূতিশীল ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবারও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজের অবশিষ্ট অর্থ জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীর হজে যাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ফলে কোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অর্থ পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, হজ ২০২৬-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সরকারের এই নির্দেশনা হজযাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। পবিত্র হজ পালনের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সময়মতো অর্থ পরিশোধ যে কতটা জরুরি, তা আবারও স্পষ্ট করে দেওয়া হলো। এখন নিবন্ধিত হজযাত্রীদের ওপরই নির্ভর করছে তারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিয়ে নির্বিঘ্নে হজযাত্রার পথে এগোতে পারবেন কি না।