জাবিতে প্রক্সি দিতে এসে ঢাবি শিক্ষার্থী আটক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৫ বার
জাবিতে প্রক্সি দিতে এসে ঢাবি শিক্ষার্থী আটক

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা একসূত্রে গাঁথা থাকে। স্বচ্ছতা, মেধা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় অনৈতিকতার অনুপ্রবেশ ঘটলে শুধু একটি পরীক্ষাই নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আটকের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

সোমবার ২২ ডিসেম্বর সকাল ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার তৃতীয় শিফট চলাকালে এই ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিল্ডিংয়ের ৪০২ নম্বর কক্ষে দায়িত্বরত শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিম একজন পরীক্ষার্থীর আচরণে অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন। পরিচয় যাচাই ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি প্রকৃত পরীক্ষার্থী নন; বরং অন্য একজনের হয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আটক করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।

আটক শিক্ষার্থীর নাম মো. এহসানুল হক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অনার্স ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ১০১৫ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নিবন্ধিত আসল পরীক্ষার্থী ছিলেন রাফিদ হোসেন সাজিদ। তার পরিবর্তে পরীক্ষাকক্ষে উপস্থিত হয়ে উত্তরপত্র লিখছিলেন এহসানুল হক।

প্রক্টর অফিসে নেওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এহসানুল হক স্বীকার করেন যে তিনি রাফিদ হোসেন সাজিদের হয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে প্রক্টরিয়াল বডি দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা থেকে আসল পরীক্ষার্থী রাফিদ হোসেন সাজিদকেও আটক করে। পরে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী প্রক্সি দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় শুধু পরীক্ষার্থীর ফল বাতিল নয়, ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম থেকেও নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত অন্যান্য পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কঠোর পরিশ্রম করে যারা নিজের যোগ্যতায় পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, তাদের সঙ্গে এমন প্রতারণা করা অনৈতিক ও অন্যায়। আবার অনেক অভিভাবক বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে কেউ কেউ যে কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন, যা সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং এটি প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার চাপ ও মূল্যবোধের সংকটের প্রতিফলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী হয়েও যদি কেউ প্রক্সি দিতে আসে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি গভীর। শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল নজরদারি, বায়োমেট্রিক যাচাইসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটছে, যা দেখিয়ে দেয় যে মানবিক সততা ছাড়া প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একা যথেষ্ট নয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষে নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত জানানো হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে পরীক্ষা শেষে বিস্তারিত ব্রিফিং করা হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অনৈতিক কাজে জড়ানোর সাহস না পায়। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, আসন সংকট ও সামাজিক প্রত্যাশার বিষয়গুলো নিয়েও রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার মতো অপরাধ রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে না পারলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আটক হওয়ার ঘটনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়, মেধা ও সুযোগের পাশাপাশি নৈতিক দৃঢ়তা না থাকলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কী হয় এবং তা ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত