প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্য। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরকারিভাবে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় দেশের প্রভাবশালী দুটি জাতীয় দৈনিক—দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেওয়া এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একদিকে যেমন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ তথ্য জানান। একই সঙ্গে ওই বৈঠকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের কাছে নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি বর্তমানে হামলার ঝুঁকিতে রয়েছেন। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিএফআই, এনএসআই এবং এসবি নিজস্ব গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকা পর্যালোচনা করে যাদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে, তাদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০ জনের একটি তালিকা সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাদের হামলার ঝুঁকিতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে যাচাই-বাছাই শেষে সবাইকে নয়, বরং প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, “আমরা আবেগের বশে বা রাজনৈতিক চাপের কারণে কাউকে গানম্যান দিইনি। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যাদের ক্ষেত্রে বাস্তব ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, অনেকেই গানম্যান নিতে আগ্রহ দেখাননি। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা সামাজিক অস্বস্তির কথা বিবেচনা করে কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রস্তাব গ্রহণ করতে চাননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ পর্যন্ত ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। তবে এই ২০ জনের সবাই রাজনীতিবিদ কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, তালিকায় সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রত্যেকের পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।
এই ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি এতটাই উদ্বেগজনক যে শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদেরও গানম্যান দিতে হচ্ছে? আবার কেউ কেউ এটিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের সম্পাদকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি দেশ-বিদেশে সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে স্বীকার করে যে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন, তখন তা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিভাজন এবং অনলাইন ও অফলাইন হুমকির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যক্তি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। বিশেষ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গানম্যান দেওয়া নয়; বরং সামগ্রিকভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কেউ মত প্রকাশ বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হুমকির মুখে পড়বে না। তাদের মতে, গানম্যান দেওয়া একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গানম্যান দেওয়া মানেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। বরং এটি একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া। একজন নাগরিকের জীবন ঝুঁকিতে থাকলে রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকতে পারে না।”
তিনি আরও জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ঝুঁকি কমে এলে বা পরিস্থিতির উন্নতি হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক ও পেশাদারভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘোষণার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যেখানে সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিনিয়ত চুরি, ছিনতাই কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, সেখানে কেবল প্রভাবশালীদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আবার অন্য একটি অংশের মত হলো, যেসব ব্যক্তি রাষ্ট্র, সমাজ বা গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই পরোক্ষভাবে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া।
সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা ২০ জনকে গানম্যান দেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে—তা নির্ভর করবে সরকারের সামগ্রিক নীতিগত অবস্থান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কতটা জোরদার করা যায় তার ওপর।