সীমান্ত সংঘর্ষ থামাতে থাইল্যান্ডকে বৈঠকের প্রস্তাব কম্বোডিয়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
থাইল্যান্ডকে বৈঠকের প্রস্তাব কম্বোডিয়ার

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুই সপ্তাহ ধরে চলা প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সম্পর্ক আবারও তীব্র উত্তেজনার মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংঘর্ষ থামাতে এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ হিসেবে থাইল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে কম্বোডিয়া। নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপির হাতে আসা কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরু থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সীমান্ত সংঘর্ষে থাইল্যান্ডে অন্তত ২৩ জন এবং কম্বোডিয়ায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। শুধু প্রাণহানিই নয়, এই সংঘর্ষের ফলে দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত উভয় দেশে মোট ৯ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালাতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে সীমান্তজুড়ে উদ্বাস্তু শিবির ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন আঞ্চলিক কূটনীতিতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো সংঘাত নিরসনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। সোমবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আসিয়ান দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও ঘোষণা দেন যে কম্বোডিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত কমিটির কাঠামোর আওতায় বুধবার থাইল্যান্ডের চান্তাবুরি প্রদেশে এই বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল।

তবে থাইল্যান্ডের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে কম্বোডিয়া। থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাত্তাফন নার্কফানিতকে পাঠানো এক চিঠিতে কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী টি সেইহা স্পষ্টভাবে বৈঠকটি কুয়ালালামপুরে আয়োজনের অনুরোধ জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সীমান্তে চলমান সংঘর্ষ ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় এই বৈঠক একটি নিরাপদ ও নিরপেক্ষ স্থানে হওয়া উচিত। তার মতে, সংঘর্ষ চলমান অবস্থায় সীমান্তবর্তী কোনো এলাকায় বৈঠক আয়োজন করা উভয় পক্ষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও জানান, আসিয়ানের বর্তমান সভাপতি দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া ইতোমধ্যেই কুয়ালালামপুরে এই আলোচনার আয়োজন করতে সম্মত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক সংস্থার সক্রিয় মধ্যস্থতার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। কুয়ালালামপুরকে নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে আসিয়ানের ঐতিহ্যগত সংঘাত নিরসন কূটনীতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন কম্বোডিয়া অভিযোগ তোলে, বৈঠকের ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই থাইল্যান্ড তাদের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মালি সোচিয়েতা জানান, থাই বাহিনীর হামলার পর সীমান্ত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মঙ্গলবার সকালেও সীমান্ত এলাকায় লড়াই চলছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষ থামানোর পরিবর্তে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আলোচনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, থাই বাহিনী সীমান্তবর্তী কম্বোডিয়ান শহর পইপেত লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করেছে। এতে বেসামরিক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে লোকজন ঘরছাড়া হয়। যদিও থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার বা আংশিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি যে ক্রমেই জটিল হচ্ছে, তা উভয় পক্ষই স্বীকার করছে।

এই সীমান্ত সংঘর্ষের পেছনে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে কয়েক দশক ধরে টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে কিছু বিতর্কিত অঞ্চল ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে অতীতেও একাধিকবার সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষ সেই পুরোনো বিরোধেরই নতুন বহিঃপ্রকাশ, তবে এবারের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণঘাতী ও মানবিকভাবে বিপর্যয়কর।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘর্ষ শুধু থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরে ‘সংলাপ ও ঐকমত্য’-এর নীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। এই সংঘর্ষ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আসিয়ানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। স্কুল, বাজার ও হাসপাতাল বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কুয়ালালামপুরে বৈঠকের প্রস্তাবকে অনেকেই ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আলোচনার মাধ্যমে অন্তত সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার পথ সুগম হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে লড়াই বন্ধ না হলে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত পরিস্থিতি এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতির কথাও শোনা যাচ্ছে। কুয়ালালামপুরে প্রস্তাবিত বৈঠক সত্যিই সংঘর্ষ থামানোর পথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কি না, সেটিই এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত