প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিস জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধ অবসানে একটি সমন্বিত শান্তি পরিকল্পনায় সমর্থন দিতে। সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আরব লীগের যৌথ তত্ত্বাবধানে আমরা সুদানে একটি সার্বিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করতে চাই। ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।”
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এই সংঘাতের ফলে দেশের পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণের কিছু অংশ এখন আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রায় দুই বছরের এই লড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের চাহিদা তীব্র হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ইদ্রিস বলেন, “বিদ্রোহী মিলিশিয়াদের দখলকৃত সব এলাকা থেকে সরে যেতে হবে এবং সুদানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরি করতে হবে। এটি আমাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, শান্তি স্থাপনের জন্য দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী ইদ্রিস জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন, তবে একটি মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই সফরের সময় তিনি মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি। এর আগে গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুদানের সংঘাত নিরসনে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তথাকথিত ‘কোয়াড’ জোট—মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এর মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনা এখনও কার্যকর সমাধানে পৌঁছায়নি।
সুদানের গৃহযুদ্ধের পটভূমি দীর্ঘ। সেনাবাহিনী এবং আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতা-বিভাজন, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক আধিপত্য অর্জনের লড়াই এই সংঘাতকে তীব্র করেছে। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা প্রতিদিনের খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার এই সংঘাতের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুদানের স্থিতিশীলতা শুধুমাত্র স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতায় সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন, বিশেষ করে জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা এবং তত্ত্বাবধান ছাড়া এই গৃহযুদ্ধ সমাধান হবে না। প্রধানমন্ত্রী ইদ্রিসের এই আহ্বানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলে সুদানের দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান সম্ভব হতে পারে।
সুদানের গৃহযুদ্ধের ফলে দেশটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম চাপের মুখে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ইদ্রিসের আহ্বান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সুদানে শান্তি প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যদি সুদানের শান্তি প্রক্রিয়ায় সমর্থন জানায়, তবে তা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, সুদানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক লড়াই এবং সামাজিক বিভাজনের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যন্ত্রণা এবং অস্থিরতার মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের আহ্বানকে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের গৃহযুদ্ধ অবসান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।