প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আলিফ হত্যা মামলা বিচার দায়রা জজ আদালতে শুরু হতে যাচ্ছে—এই খবর দেশের আইনাঙ্গন ও সচেতন মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বহুল আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে মামলাটি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–১ এর ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিক এ আদেশ দেন। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত আলিফের বাবা ও মামলার বাদী জামাল উদ্দিন।
এই আদেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ তদন্ত ও প্রাথমিক বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। মামলার নথি দায়রা জজ আদালতে পৌঁছানোর মাধ্যমে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর পথ সুগম হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। তবে একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি নেওয়ার দাবি আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।
আদালতের আদেশের পরপরই বাদী জামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বরাবর একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনে তিনি মামলাটি বিশেষ বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের দাবি জানান। তার ভাষায়, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড নয়; বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি ঘটনা। এ কারণে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।
মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১ জুন ২০২৫ তারিখে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট দাখিল করে। পরে ১৫ আগস্ট আদালত সেই চার্জশিট গ্রহণ করেন। চার্জশিটে মোট ৩৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামি এখনো পলাতক। আদালত সূত্র জানায়, ১৭ জন আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি ক্রোক ও হুলিয়া জারির আদেশ দেওয়া হয়। পলাতকদের ধরতে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারি কৌশলী রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী আদালতে বলেন, নিম্ন আদালতের সব আইনি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষ্য, চার্জশিট গ্রহণ, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনসহ প্রাথমিক ধাপগুলো শেষ হওয়ায় মামলাটি এখন পূর্ণাঙ্গ বিচারের জন্য প্রস্তুত। এই কারণেই মামলাটি দায়রা জজ আদালতে প্রেরণের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে এগোবে।
আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় এক অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত এই ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে একজন আইনজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা দেশের বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, উগ্রবাদী সংগঠন ইসকনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন আলিফ। এই হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
আইনজীবী সমাজ এ ঘটনাকে শুধু একজন সহকর্মীর মৃত্যু হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে বিচারাঙ্গনে নিরাপত্তাহীনতার একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি এবং বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশন তখন একাধিক কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের দাবি ছিল, এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে ভবিষ্যতে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি মামলা হওয়া সত্ত্বেও এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় জনমনে উদ্বেগ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা মনে করছেন, সাধারণ দায়রা জজ আদালতে বিচার শুরু হলেও মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হলে বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে। এতে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ মোকাবিলা করাও তুলনামূলক সহজ হবে।
নিহত আলিফের পরিবারও একই দাবি জানিয়ে আসছে। বাদী জামাল উদ্দিন বিভিন্ন সময় বলেছেন, তার ছেলে শুধু একজন আইনজীবী ছিলেন না; তিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে একজন সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন। প্রকাশ্য আদালত প্রাঙ্গণে তাকে হত্যা করা মানে পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত। তাই এই মামলার বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে এবং অপরাধীরা দ্রুত শাস্তির আওতায় আসে, সেটাই পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়রা জজ আদালতে বিচার শুরু হওয়া একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে মামলার সংখ্যা, আসামির পরিমাণ এবং ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জনমনে আস্থা ফিরবে।