গাজার বৃদ্ধ গোরখোদক ১৮ হাজার ফিলিস্তিনিকে দাফন করেছেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬ বার

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

গাজার ৬৫ বছর বয়সী গোরখোদক ইউসেফ আবু হাতাব ইসরায়েলি হামলায় নিহত প্রায় ১৮ হাজার ফিলিস্তিনিকে দাফন করে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের কবরস্থানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে একের পর এক মরদেহ দাফনের এই কাজের জন্য হাতাবকে স্থানীয়রা ‘মানবতার নীরব রক্ষক’ বলে অভিহিত করেছেন। বার্তা সংস্থা আনাদোলু প্রতিবেদন দিয়েছে, ফাটা হাতে কোদাল হাতে করে তিনি বহুজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন, যদিও অধিকাংশ মরদেহের নাম–পরিচয় ছিল না, কারণ ইসরায়েলের নির্বিচার বোমায় শরীরগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

ইউসেফ আবু হাতাব জানিয়েছেন, “অকল্পনীয় চাপ ও বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর মধ্যে আমরা গণকবর, ব্যক্তিগত কবর এবং হাসপাতালের ভেতরে মরদেহ দাফন করেছি। একবার আমাকে এক গর্তে ১৫টি মরদেহ একসাথে দাফন করতে হয়।” ২০০৫ সাল থেকে হাতাব কবর খননের কাজে নিয়োজিত, কিন্তু এবারের ইসরায়েলি হামলাকে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পুরো যুদ্ধজুড়ে প্রায় ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার ফিলিস্তিনির দাফন করেছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতকালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। গত ১০ অক্টোবর ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও চুক্তি লঙ্ঘনের ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পরেও অন্তত ৪০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

হাতাব প্রতিদিন ভোর ৬টায় কাজ শুরু করেন এবং কখনো কখনো সূর্যাস্তের পরও কাজ চালিয়ে যান। সরঞ্জাম ও উপকরণের অভাবের কারণে তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে আনা পাথর ও টাইলস ব্যবহার করে কবর মেরামত করেন এবং মৃতদের সম্মান জানানোর চেষ্টা করেন। তিনি জানিয়েছেন, ইসরায়েলি অবরোধের কারণে কবর তৈরির সামগ্রী, কাফন বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সহজলভ্য নয়।

যুদ্ধের তীব্রতা ও দৈনন্দিন মৃত্যুর ঘটনায় গাজার বাসিন্দারা অস্থায়ী কবরস্থানের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছেন। আবু হাতাব বলেন, “প্রতিদিন এখনো কিছু মরদেহ আসে, যদিও যুদ্ধের শুরুতে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি করে মরদেহ দাফন করতে হতো। একবার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে একাই প্রায় ৫৫০টি মরদেহ দাফন করেছি।”

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শহরের ৬০টি কবরস্থানের মধ্যে ৪০টি ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করেছে এবং ১ হাজারের বেশি মরদেহ চুরি হয়েছে। হাসপাতালের গণকবর থেকে ৫২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও এখনও ১০ হাজারের বেশি মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা রয়েছে।

কর্মীর অভাব ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে আবু হাতাব একাই মৃতদেহ ধোয়ানো, কাফন পরানো, দাফন এবং নথিভুক্তকরণ কাজ করছেন। তিনি সমস্ত কাজ নিজের মুঠোফোনে রেকর্ড করে রাখছেন। হাতাব স্মরণ করেছেন সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলো, যেমন এক বাকপ্রতিবন্ধী নারী ও তাঁর চার সন্তানকে দাফন করা এবং পরবর্তীতে অজ্ঞাত দেহাবশেষও একই স্থানে দাফন করা।

হাতাব বলেন, “এমন অনেক রাত যায় যখন আমি একদমই ঘুমাতে পারি না। জানাজার শব্দ, মানুষের চিৎকার এবং বোমার আওয়াজ সারাক্ষণ আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হয়।” তাঁর গল্প মানবতার প্রতি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং ফিলিস্তিনে চলমান সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে।

এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন গোরখোদকের নৈতিক ও শারীরিক পরিশ্রম নয়, বরং ফিলিস্তিনে চলমান যুদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত চিত্রকে বিশ্বজুড়ে তুলে ধরে। ইউসেফ আবু হাতাবের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহস মানবিক সহমর্মিতা, ধৈর্য ও মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের এক অসামান্য উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে থাকবে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত