প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দ্বাদশ আসর শুরুর অপেক্ষায় ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রতিবারের মতো এবারও বিপিএল মানেই রোমাঞ্চ, তারকাবহুল স্কোয়াড আর শিরোপার লড়াই। এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই শিরোপাপ্রত্যাশীদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছে রংপুর রাইডার্স। বিপিএলের পুরোনো ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে অন্যতম এই দলটি প্রতিটি মৌসুমেই ট্রফির স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে। তবে এবারের রংপুর রাইডার্সকে অন্যবারের তুলনায় আরও পরিণত, পরিকল্পিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
দেশি ও বিদেশি ক্রিকেটারের সমন্বয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড গড়ে তুলেছে নুরুল হাসান সোহানের নেতৃত্বাধীন দলটি। ব্যাটিং, বোলিং ও অলরাউন্ড সামর্থ্যের দিক থেকে রংপুর রাইডার্স এবারে এমন একটি দল সাজিয়েছে, যেখানে একাদশের প্রতিটি জায়গায় বিকল্প আছে। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে তৈরি এই স্কোয়াডে যেমন আছেন লিটন দাস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞরা, তেমনি আছেন তাওহিদ হৃদয়, নাহিদ রানার মতো তরুণরা, যারা যেকোনো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
রংপুর রাইডার্সের ব্যাটিং লাইনআপ এবার বেশ গভীর ও শক্তিশালী। ওপেনিংয়ে সম্ভাব্য জুটি হিসেবে দেখা যেতে পারে ডেভিড মালান ও খাজা নাফেকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিজ্ঞ এই দুই ব্যাটার টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে যেকোনো বোলিং আক্রমণকে চাপে ফেলতে সক্ষম। তাদের সঙ্গে টপ অর্ডারে দেশি ব্যাটার হিসেবে থাকবেন ইফতেখার হোসেন ইফতি, লিটন দাস ও তাওহিদ হৃদয়। বিশেষ করে লিটন দাসের সাম্প্রতিক ফর্ম রংপুর শিবিরে বাড়তি আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে। জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করা এই উইকেটকিপার-ব্যাটার বিপিএলেও নিজের ছন্দ ধরে রাখতে পারলে দলের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠবেন।
মিডল অর্ডারে অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান দলের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। চাপের মুখে দলকে সামলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে তার। তার সঙ্গে মিডল অর্ডারে মোহাম্মদ আখলাকের মতো ব্যাটাররা আছেন, যারা প্রয়োজনে দ্রুত রান তুলতে পারেন। লোয়ার মিডল অর্ডারে রংপুর রাইডার্স ভরসা রাখছে মূলত বিদেশি অলরাউন্ডারদের ওপর। খুশদিল শাহ, ফাহিম আশরাফ ও ইফতিখার আহমেদের মতো ক্রিকেটাররা ব্যাট হাতে যেমন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন, তেমনি প্রয়োজনে বল হাতেও অবদান রাখতে সক্ষম। এ কারণে ব্যাটিং অর্ডারে এক ধরনের বিদেশি নির্ভরতা দেখা গেলেও সেটি দলকে গভীরতা দিয়েছে।
বোলিং বিভাগে রংপুর রাইডার্সের মূল শক্তি দেশি ক্রিকেটাররা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম কার্যকর বোলার মোস্তাফিজুর রহমানের কাঁধেই থাকবে আক্রমণের বড় দায়িত্ব। ডেথ ওভারে তার কাটার ও স্লোয়ারগুলো বিপিএলের মঞ্চে বরাবরই কার্যকর। তার সঙ্গে তরুণ পেসার নাহিদ রানা গতি দিয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের চাপে রাখার চেষ্টা করবেন। স্পিন বিভাগে দলে আছেন আলিস আল ইসলাম, যিনি গত বিপিএলে দারুণ পারফরম্যান্স করে আলোচনায় এসেছিলেন। যদিও দীর্ঘ বিরতির পর মাঠে ফিরছেন তিনি, তবে নিজের রহস্যময় স্পিন দিয়ে ম্যাচে প্রভাব রাখার সামর্থ্য তার রয়েছে।
অলরাউন্ডার হিসেবে কাইল মায়ার্স রংপুর রাইডার্সের জন্য বড় অস্ত্র হতে পারেন। ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই সমানভাবে অবদান রাখতে পারেন এই ক্যারিবীয় ক্রিকেটার। তার সঙ্গে ফাহিম আশরাফ, খুশদিল শাহ ও ইফতিখার আহমেদের মতো অলরাউন্ডাররা থাকায় দলে ভারসাম্য আরও দৃঢ় হয়েছে। একাদশে কাউকে খেলানো না খেলানো নিয়ে কোচিং স্টাফের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন হলেও এটি দলকে কৌশলগত সুবিধা দেবে।
রংপুর রাইডার্স এবারের বিপিএলের জন্য মোট ১০ জন বিদেশি ক্রিকেটারকে দলে ভিড়িয়েছে। বিসিবির নিয়ম অনুযায়ী একাদশে একসঙ্গে চারজন বিদেশি খেলানোর সুযোগ থাকায় বিদেশি নির্বাচন নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি বিদেশি ক্রিকেটারই নিয়মিত পারফর্মার হওয়ায় এই ‘মধুর সমস্যা’কেই শক্তিতে পরিণত করতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট। আগের আসরে হুটহাট বিদেশি খেলোয়াড় দলে এনে একাদশে খেলানোর কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছিল রংপুর। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই সব বিদেশি ক্রিকেটারকে স্কোয়াডে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দল গঠনে ধারাবাহিকতা থাকে।
শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি সিরিজের কারণে ইফতিখার আহমেদ ও খুশদিল শাহ বিপিএলের মাঝপথে কয়েক দিনের জন্য অনুপস্থিত থাকতে পারেন। এই সম্ভাবনাও বিবেচনায় রেখেই রংপুর রাইডার্স বাড়তি বিদেশি ক্রিকেটার দলে রেখেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দল যাতে ভারসাম্য না হারায়, সে দিকেও নজর রাখা হয়েছে।
আগামী ২৭ ডিসেম্বর বিপিএল মিশন শুরু করতে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেবে রংপুর রাইডার্স। ২৯ ডিসেম্বর নবাগত চট্টগ্রাম রয়্যালসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের এবারের আসরের যাত্রা। নতুন মৌসুমে নিজেদের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির প্রতিফলন মাঠে কতটা দেখা যাবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সমর্থকরা।
সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য ও কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয়ে রংপুর রাইডার্স এবারের বিপিএলে নিঃসন্দেহে শিরোপার অন্যতম দাবিদার। মাঠের পারফরম্যান্স যদি কাগজের শক্তির প্রতিফলন ঘটাতে পারে, তবে ট্রফির লড়াইয়ে দলটিকে সবার ওপরে রাখতেই হবে।