প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধকে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী ও বিপজ্জনক পদক্ষেপ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে দুই পরাশক্তি একযোগে ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে। তাদের ভাষায়, ভেনেজুয়েলার জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতা শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনই নয়, বরং গোটা লাতিন আমেরিকাকে নতুন করে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বন্দর থেকে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী অনুমোদিত তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে আটকানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়, যেখানে রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ ও ‘ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি’ চালানোর অভিযোগ তোলে।
জাতিসংঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া তার বক্তব্যে বলেন, তথাকথিত নৌ অবরোধ আসলে একটি স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অবৈধ রূপ। তিনি একে ‘প্রকৃত আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নেবেনজিয়ার ভাষায়, পূর্ণ অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যার মূল লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলায় এমন একটি সরকার পরিবর্তন ঘটানো, যা ওয়াশিংটনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তখনই কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার কথা বলে, যখন সেই দেশের সরকার তার কৌশলগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে একমত হয়। অন্যথায় অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগই যেন হয়ে ওঠে তাদের প্রধান হাতিয়ার। তার বক্তব্যে পরিষদের অনেক সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা গভীর মনোযোগ দিয়ে বিষয়টি শোনেন।
চীনও রাশিয়ার এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় মুখর হয়। জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি বলেন, ভেনেজুয়েলার জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি শক্তির মাধ্যমে ভয় দেখানোর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বেইজিংয়ের মতে, এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ শুধু সংশ্লিষ্ট দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক হুমকি তৈরি করে।
চীনা প্রতিনিধি আরও বলেন, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সামরিক অবরোধ আরোপ করলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানই আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
এদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার মার্কিন নৌবাহিনীর পদক্ষেপকে সরাসরি ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কারাকাসের অভিযোগ, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার বন্দর ছেড়ে যাওয়া কমপক্ষে দুটি জাহাজ জোরপূর্বক আটক করেছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান নতুন কিছু নয়। দেশটির তেল শিল্প ও রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎসকে লক্ষ্য করে ওয়াশিংটন আগে থেকেই নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। তবে নৌ অবরোধের মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। কারণ, এতে সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাশিয়া ও চীনের প্রকাশ্য বিরোধিতাকে অনেকেই বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মস্কো ও বেইজিং প্রায়ই এক কণ্ঠে কথা বলছে। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতেও সেই ঐক্য আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে করে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নৌ অবরোধ শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলো ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও নজির হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নৌ অবরোধকে ঘিরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যে উত্তপ্ত বিতর্ক দেখা গেল, তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকবে নাকি শক্তির রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে—তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে বড় শক্তিগুলোর অবস্থান ও আলোচনার অগ্রগতির ওপর।