বাইডেন আমলের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার, কূটনীতিতে ট্রাম্পের ছাঁটাই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭১ বার
বাইডেন আমলের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করল ট্রাম্প প্রশাসন

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনকে সামনে রেখে তিনি প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাইডেন প্রশাসনের আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৩০ জন রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ বিদেশি কূটনীতিককে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তকে একদিকে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও অন্যদিকে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতির ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যাহার করা রাষ্ট্রদূতদের নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সোমবার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের পরিবর্তন একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া। তবে তিনি স্বীকার করেন, এবারের প্রত্যাহার তুলনামূলকভাবে ব্যাপক এবং এর পেছনে প্রশাসনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন রাষ্ট্রদূত মূলত প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ফলে প্রেসিডেন্টের অধিকার রয়েছে নিশ্চিত করার যে, বিদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরা তার নীতিগত অবস্থান ও রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে সেই দর্শন হলো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, যেখানে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই লক্ষ্য পূরণে প্রশাসনের প্রতি অনুগত ও নীতিগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিদেরই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে বসাতে চান প্রেসিডেন্ট।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রত্যাহার করা রাষ্ট্রদূতদের সরাসরি বরখাস্ত করা হচ্ছে না। বরং তাদের অন্য দায়িত্বে পুনর্নিয়োগের সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়; বরং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস। তবুও বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের প্রত্যাহারের পরিকল্পনার খবর প্রথম প্রকাশ করে রাজনৈতিক বিষয়ক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম পলিটিকো। এরপর থেকেই ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তুঙ্গে ওঠে। পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে কমপক্ষে ২৯টি দেশের মিশনপ্রধানকে জানানো হয়েছে যে, তাদের বর্তমান দায়িত্বের মেয়াদ আগামী বছরের জানুয়ারিতে শেষ হবে। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যাহার হওয়া রাষ্ট্রদূতদের সবাই সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে অনেক বিশ্লেষক একে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দিককার ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবে দেখছেন, যা মূলত রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। বুধবার ওয়াশিংটন থেকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রদূতদের কাছে প্রত্যাহারের নোটিস পৌঁছাতে শুরু করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

যদিও রাষ্ট্রদূত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া, তবুও এবারের পদক্ষেপের ব্যাপকতা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করা হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে। বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, গ্যাবন, আইভরি কোস্ট, মাদাগাস্কার, মরিশাস, নাইজার, নাইজেরিয়া, রুয়ান্ডা, সেনেগাল, সোমালিয়া এবং উগান্ডার মতো দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

এশিয়া মহাদেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফিজি, লাওস, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূতদের তালিকায় রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ইউরোপেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। আর্মেনিয়া, ম্যাসেডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো এবং স্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রদূতরাও প্রত্যাহারের তালিকায় রয়েছেন।

এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন সংগঠন এবং আইনজীবীরা। আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নিকি গেমার এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারের এ পদক্ষেপ অত্যন্ত অনিয়মিত, আকস্মিক এবং ব্যাখ্যাহীন। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নাশকতা ও অতিরিক্ত রাজনীতিকরণের প্রতিফলন, যা বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, হঠাৎ করে এত বড় পরিসরে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করলে অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কার্যক্রমে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এই শূন্যতার সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো প্রভাব বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া যেসব অঞ্চলে সক্রিয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহলের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, বাইডেন আমলের অনেক কূটনীতিক ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নন। ফলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাস্তবায়নে তাদের রেখে লাভ নেই। প্রশাসনের দাবি, নতুন ও অনুগত রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আরও কার্যকর ও দৃঢ় হবে।

সব মিলিয়ে, প্রায় ৩০ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক কৌশলের একটি বড় ইঙ্গিত বহন করছে। এটি শুধু প্রশাসনিক পুনর্গঠন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আদর্শিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রতিফলন। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল করবে, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি লাগতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত