মার্কিন অবরোধে সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলায় কঠোর আইন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
মার্কিন অবরোধে সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলায় কঠোর আইন

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন নৌ-অবরোধে সমর্থন ও অর্থায়নের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন একটি আইন পাস করেছে ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্ট। মঙ্গলবার পাস হওয়া এই আইনে সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার বলছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান রক্ষার জন্য এই আইন জরুরি। অন্যদিকে সমালোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, আইনটি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনেও ব্যবহার হতে পারে। আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই আইন পাসের ঘটনাকে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছে।

আইনটি এমন এক সময়ে পাস হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করেছে। ভেনেজুয়েলার সরকার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং কার্যত জলদস্যুতার সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যাহত হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

পার্লামেন্টে আইনটি উপস্থাপনকালে সংসদ সদস্য জিউসেপে আলেসান্দ্রেলো বলেন, এই আইন ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে এবং জনগণের জীবনমান আরও অবনতি হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয়। তার বক্তব্যে উঠে আসে, বিদেশি শক্তির চাপের মুখে দেশের ভেতরে এমন কিছু গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যারা অর্থনৈতিক অবরোধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। সরকারের দাবি, এই সহায়তা কখনো অর্থায়নের মাধ্যমে, কখনো তথ্য আদান–প্রদানের মাধ্যমে কিংবা রাজনৈতিক সমর্থনের আকারে হয়ে থাকে।

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর বিভিন্ন পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতি দমন। তবে ভেনেজুয়েলার সরকার বরাবরই বলে আসছে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং সরকারের পতন ঘটানোর কৌশল। নতুন আইনটি সেই দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করছে ভেনেজুয়েলা। একই সঙ্গে মাদক পাচার দমনের অজুহাতে কিছু সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী। সরকারের মতে, একতরফাভাবে কোনো দেশের জলসীমা বা আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী জাহাজ আটক করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইনটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সরকার সমর্থকেরা বলছেন, আইনটি জাতীয় ঐক্য জোরদার করবে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর কিছু অংশ আশঙ্কা করছে, আইনের অস্পষ্ট ধারা রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে। তারা বলছে, “সমর্থন” বা “অর্থায়ন” শব্দগুলোর ব্যাখ্যা যদি স্পষ্ট না হয়, তবে যেকোনো সমালোচনামূলক অবস্থানকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই আইন পাসের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু লাতিন আমেরিকান দেশ ভেনেজুয়েলার সার্বভৌম অধিকার রক্ষার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র কয়েকটি দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, এই আইন মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তারা ভেনেজুয়েলা সরকারকে রাজনৈতিক সংলাপ ও কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধি সামুয়েল মনকাদা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আগ্রাসী আচরণ করছে। তার বক্তব্যে উঠে আসে, ভেনেজুয়েলা কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়; বরং হুমকি সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি ও শক্তি প্রদর্শন। মনকাদা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নিষেধাজ্ঞার মানবিক প্রভাব বিবেচনা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানে এগিয়ে আসা।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন আইন ও চলমান নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার জনগণ ইতিমধ্যে খাদ্যাভাব, ওষুধ সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ অনুভব করছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি অবরোধের কারণে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব কমে যাওয়ায় সামাজিক খাতে ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন আইনটি এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে সরকার আশা প্রকাশ করছে, যদিও বাস্তবে এর ফলাফল কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন পাস ভেনেজুয়েলা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দেবে। একদিকে একটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌম অধিকার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলছে, অন্যদিকে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যকার ভারসাম্যই আগামী দিনে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত