প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মিয়ানমারের জনগণ সামনেই আসন্ন সেনা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। তবে দেশের সাধারণ মানুষকে ভোট দিতে বা ভোট থেকে বিরত রাখতে উভয়পক্ষই নৃশংসতা, ভয়ভীতি এবং দমনপীড়নের চরম প্রয়োগ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনগণ এই নির্বাচনের আগে দ্বিমুখী চাপের মধ্যে দিন পার করছে, যা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করেছে।
আগামী রোববার, ২৮ ডিসেম্বর, মিয়ানমারে শুরু হতে যাচ্ছে মাসব্যাপী জাতীয় নির্বাচন, যা সেনা নিয়ন্ত্রিত। নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন দেশজুড়ে সহিংসতা, গ্রেফতার এবং ভয়-ভীতি চরমে পৌঁছেছে। একদিকে জান্তাবাহিনী সাধারণ মানুষকে ভোট দিতে বাধ্য করতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাপ প্রয়োগ করছে। নির্বাচনের নিরাপত্তা আইনের আওতায় বহু মানুষ ইতিমধ্যেই আটক হয়েছেন। কোথাও কোথাও ৪০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেওয়ার তথ্য মিলেছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ভরকার তুর্ক বলেন, এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও অবাধভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীও নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের প্রশাসনিক দফতরে বোমা হামলায় নির্বাচনকর্মীরা আহত হয়েছেন। এই সহিংস পরিস্থিতি নির্বাচনকে ভীতিজনক এবং অস্থিতিশীল করে তুলেছে। জনগণ একদিকে ভোট দিতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার শিকার হতে হচ্ছে। ফলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবন নিরাপত্তাহীনতায় ভরে গেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশ চীন মিয়ানমারের সেনা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘাত প্রশমনে চীনের মধ্যস্থতায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে, যা জান্তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে অনেকেই এই অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
পিপলস ডিফেন্স ফোর্স এবং জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষও নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। জান্তা বাহিনী উত্তর মান্দালয়ের সিঙ্গু শহর পুনর্দখলের পর ইরাবতী নদীর দুই পাশে সাগাইং ও মান্দালয় এলাকায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়া বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এই ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং নির্বাচনের পরিবেশকে ভয়াবহ ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করান, মিয়ানমারের জনগণ ইতিমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে সেনা শাসনের মধ্যে জীবনযাপন করছে। চলমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক চাপ মিলে জনগণকে ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে বা বিরত থাকতে বাধ্য করছে। এর ফলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের হাইকমিশনার মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, মিয়ানমারের জনগণ একদিকে সেনা বাহিনীর নৃশংসতা ভোগ করছে, অন্যদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দমন-পীড়নের মুখোমুখি হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপ তাদের জীবনকে অতিরিক্ত দুর্বিষহ করেছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের সরকার ও সেনা বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জীবনে মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে গেছে। ভোট দিতে বাধ্য হওয়ার ভয়, হামলার শিকার হওয়ার ভয় এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে জনগণের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশজুড়ে এই দ্বিমুখী সংকট অব্যাহত থাকায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা, অবাধ ও অর্থবহতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ নির্বাচনের আগে এক ভয়াবহ দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে সেনা বাহিনী ভোটের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী জনগণকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দিচ্ছে। এই অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখা জটিল হয়ে উঠেছে।