হাটহাজারীর জুলাই সহিংসতা: সাবেক এমপি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গ্রেপ্তারের আবেদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ গ্রেপ্তার আবেদন

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জুলাই ২০২৪-এ সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে গ্রেপ্তারের আবেদন করা হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, স্বৈরাচারী শাসনের প্রত্যক্ষ মদদ ও নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলি চালানোর ঘটনায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আবেদনকারীর দাবি, একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তিনি এখনো গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন এবং এতে নিহতদের পরিবারসহ স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার বরাবরে এ আবেদন করেন কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানার মো. ওমর ফারুক। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকায় বসবাস করছেন বলে আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়, গত ৫ আগস্ট ২০২৪ হাটহাজারী পৌরসভার আওতাধীন বাসস্ট্যান্ড গোল চত্বরে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার নথি অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় একাধিক ব্যক্তি নিহত ও আহত হন। পরবর্তীতে ২ অক্টোবর ২০২৪ হাটহাজারী মডেল থানায় একটি হত্যা ও সহিংসতা সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে সাবেক এমপি আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে এক নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আবেদনপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি সাবেক ক্ষমতাসীন কাঠামোর একজন সক্রিয় সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি শুধু ঘটনার সময় নির্দেশদাতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং সরাসরি সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। মামলার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও তাঁর অনুসারী ও ক্যাডার বাহিনী মামলা প্রত্যাহারের জন্য বাদী ও সাক্ষীদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি হাটহাজারী এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় নিহতদের পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আবেদনকারীর মতে, একজন এজাহারভুক্ত আসামির এভাবে অবাধ চলাচল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং ন্যায়বিচারের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। একটি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়—এমন বক্তব্যও আবেদনে উঠে এসেছে।

মো. ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে জানান, তাঁর এই আবেদন কোনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে নয়; বরং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাঁর ভাষায়, জুলাই মাসের সহিংসতায় নিহতদের রক্তের দাবিই হচ্ছে দ্রুত গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু বিচার। তিনি বলেন, মামলার বাদী ও সাক্ষীরা এখনো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আবেদনপত্রে উল্লেখ করা অন্যান্য মামলার তথ্য অনুযায়ী, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ডবলমুরিং থানার মামলা নম্বর ১৫(০৯) ২০২৪, হাটহাজারী থানার মামলা নম্বর ২(১১) ২০২৪ এবং কোতোয়ালি থানার মামলা নম্বর ১২(১১) ২০২৪-এও এজাহারভুক্ত আসামি। একাধিক থানায় দায়ের হওয়া এসব মামলার প্রেক্ষাপটে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি ও গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে আবেদনকারীর বক্তব্য।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একাধিক মামলায় এজাহারভুক্ত কোনো আসামির ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার বিলম্বিত হলে তা বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের মানসিক নিরাপত্তা—সবকিছুর সঙ্গেই দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা জড়িত। তাঁদের মতে, গ্রেপ্তার ও তদন্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হয়।

মানবাধিকারকর্মীদের একাংশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার মামলাগুলোতে বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে পরিচয় বা প্রভাবই রাখুন না কেন, আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে।

এদিকে, আবেদনকারী জানিয়েছেন যে, চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বরাবরে আবেদনটির অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি; তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

হাটহাজারীর জুলাই সহিংসতা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত ও সংবেদনশীল অধ্যায়। নিহতদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা বিলম্ব না ঘটিয়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক এমপি আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে গ্রেপ্তারের আবেদন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এবং জনমনে প্রশ্ন জাগিয়েছে—আইনের শাসন কি এবার নিরপেক্ষভাবে কার্যকর হবে?

সময়ই বলে দেবে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়। তবে ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের দাবি একটাই—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সহিংসতার দায়ে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত