প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ–১ আসনে বিএনপির ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। তাহিরপুর–জামালগঞ্জ–মধ্যনগর–ধর্মপাশা নিয়ে গঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন কামরুজ্জামান কামরুল। মাঠপর্যায়ে তাঁর প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বুধবার দুপুরে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিকের কার্যালয় থেকে কামরুজ্জামান কামরুলের পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। ফরম সংগ্রহ করেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান, যিনি কামরুলের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আশরাফুল আলম, সমাজসেবক আতিকুর রহমান আতিক, কৃষক নেতা বশির আহমেদ, আলী আহমদ, আবু জহরসহ স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মী। এই উপস্থিতি থেকেই স্পষ্ট, মাঠপর্যায়ে কামরুলের পক্ষে একটি সংগঠিত বলয় ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ–১ আসনের এমপি পদপ্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুলের পক্ষে তাঁর অনুসারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ধাপে মনোনয়ন দাখিল, যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তাঁর ভাষায়, “আমি ঢাকায় আছি। আমার পক্ষে মেহেদী হাসান উজ্জ্বলসহ অনেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।” তিনি আরও জানান, স্থানীয় জনগণের আগ্রহ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য তিনি এড়িয়ে যান, তবে তাঁর সমর্থকরা বলছেন, এটি ‘জনগণের দাবি’ থেকেই নেওয়া সিদ্ধান্ত।
সুনামগঞ্জ–১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। হাওরাঞ্চল অধ্যুষিত এই এলাকায় কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ ও প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বেশি। স্থানীয় উন্নয়ন, হাওর রক্ষা, ফসল রক্ষা বাঁধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান—এসব ইস্যু বরাবরই নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা অনেক নেতাকর্মী দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত হচ্ছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থিতার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের ব্যাখ্যা।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কামরুজ্জামান কামরুলের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া বিএনপির জন্য একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরছে। তাঁদের মতে, যদি বিদ্রোহী প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে, তবে ভোটের মাঠে বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি বিএনপির মধ্যেই ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে আসনটির ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও সংগঠিত কোনো নেতাকে পুরোপুরি দমিয়ে রাখা সহজ নয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহী প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে দলীয় প্রার্থীর সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলেছেন।
তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা—এই চার উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ–১ আসনে কামরুজ্জামান কামরুল দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা রেখে আসছেন বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি। তাঁরা বলছেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, বন্যা ও ফসলহানির সমস্যা, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা—এসব বিষয় নিয়ে কামরুল নিয়মিত মাঠে থেকেছেন। সেই ধারাবাহিকতার ফলেই তাঁর পক্ষে জনসমর্থন তৈরি হয়েছে।
এদিকে, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হকের পক্ষ থেকেও নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর সমর্থকরা মনে করছেন, দলীয় প্রতীক ও কেন্দ্রীয় সমর্থনই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এগিয়ে রাখবে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে প্রচার-প্রচারণার মাঠে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হতে পারে বলেও তারা স্বীকার করছেন।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোটাররা বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ পান, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, দলীয় বিভক্তি হলে বিরোধী শক্তি সুবিধা নিতে পারে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মতো এলাকায় যেখানে ভোটের ব্যবধান অনেক সময় খুব কম থাকে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জ–১ আসনে কামরুজ্জামান কামরুলের বিদ্রোহী প্রার্থিতা ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মনোনয়ন দাখিল ও যাচাই-বাছাইয়ের পর এই প্রার্থিতা চূড়ান্ত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই বিদ্রোহী অবস্থান বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিকে যেমন নাড়া দিয়েছে, তেমনি ভোটের মাঠকে করেছে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত।