প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব বড়দিনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বড়দিন উদযাপনকে ভাবগম্ভীর ও উৎসবমুখর রাখতে বুধবার সন্ধ্যা থেকে টানা ৩৬ ঘণ্টা ঢাকা মহানগর এলাকায় সব ধরনের আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ফানুস ও গ্যাস বেলুন উড়ানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা বড়দিনের আগের দিন থেকে শুরু হয়ে উৎসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বুধবার ২৪ ডিসেম্বর দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ২৫ ডিসেম্বর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশে শুভ বড়দিন উদযাপন করবে। এ উপলক্ষে রাজধানীর গির্জা ও খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটবে। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স (অর্ডিন্যান্স নং-III/৭৬)-এর ২৮ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৬ ডিসেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এই সময়ের মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ফানুস ও গ্যাস বেলুন উড়ানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্ক করেছে পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বড়দিন একটি শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা বহনকারী উৎসব। এদিন প্রার্থনা, উপাসনা এবং পারিবারিক মিলনমেলার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত আতশবাজি ও ফানুস উড়ানোর কারণে অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ লাইনের ক্ষতি কিংবা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে এ ধরনের কার্যক্রম জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই উৎসবের আনন্দ যেন কোনো দুর্ঘটনায় ম্লান না হয়, সে লক্ষ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতারাও পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বড়দিনের মূল চেতনা হলো শান্তি, ভালোবাসা ও সহাবস্থান। শব্দদূষণ বা অগ্নিঝুঁকির মতো বিষয়গুলো এ উৎসবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক গির্জা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বড়দিন উপলক্ষে প্রার্থনা সভা, ধর্মীয় গান ও সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএমপির এই সিদ্ধান্তে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর ফলে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পায়, যা শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তাছাড়া ফানুস ও গ্যাস বেলুন উড়ানোর কারণে অনেক সময় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎসব উদযাপনে আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি।
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বড়দিন উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ গির্জা, উপাসনালয় ও খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। টহল জোরদার করা হবে এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হবে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, বড়দিনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান সুষ্ঠু ও নিরাপদে সম্পন্ন করতে নগরবাসীর সার্বিক সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি সকলকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা কোনো উৎসবের আনন্দ নষ্ট করার জন্য নয়, বরং সবার নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার স্বার্থেই জারি করা হয়েছে। নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ উৎসব আয়োজন সম্ভব।
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, উৎসবের নামে অনিয়ন্ত্রিত আতশবাজি ও পটকার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড়দিনের মতো ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা অন্য উৎসবগুলোর ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে কেউ কেউ বিকল্প আনন্দ আয়োজনের সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেছেন, যাতে শিশু ও তরুণদের উৎসবের আনন্দ বজায় থাকে, আবার নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
সব মিলিয়ে, বড়দিনকে কেন্দ্র করে ডিএমপির এই নিষেধাজ্ঞা রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে চর্চা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, বড়দিন উপলক্ষে এই সিদ্ধান্ত তা আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন নগরবাসীর দায়িত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনা মেনে নিয়ে উৎসবকে নিরাপদ, আনন্দময় ও মানবিক করে তোলা।