প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কনকনে শীতের দাপটে কাঁপছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ। ভোর থেকে সকাল, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা—দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে। উত্তরের দিক থেকে বয়ে আসা হিমেল বাতাস, তাপমাত্রার ক্রমাগত পতন এবং ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের দেখা না পাওয়ায় শীতের অনুভূতি যেন আরও বেড়ে গেছে। যদিও আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের কোথাও এখনো শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়নি, তবুও বাস্তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই শীত বেশ কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। রাতের তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, একই সঙ্গে দিনের তাপমাত্রাও সামান্য কমতে পারে। এর ফলে শীতের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। বিশেষ করে ভোররাত ও সকালের দিকে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হবে।
সিনপটিক অবস্থার ব্যাখ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দুই আবহাওয়াগত অবস্থার প্রভাবে সারা দেশে আবহাওয়া মূলত শুষ্ক থাকলেও আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা শীতের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বুধবার রাত পৌনে ৯টার দিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ না থাকলেও শীতের অনুভূতি বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো ঘন কুয়াশা এবং উত্তরের দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের প্রবাহ। তিনি জানান, ধীরে ধীরে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং আগামী মাসের শুরুতে শীত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলায়, যেখানে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এছাড়া দেশের উত্তরের বিভিন্ন জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ থেকে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। রাজধানী ঢাকায় এদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সংখ্যাগতভাবে তাপমাত্রা খুব বেশি কম না হলেও বাতাসের আর্দ্রতা, কুয়াশা এবং সূর্যের অনুপস্থিতির কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সন্ধ্যার পর থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে হিমেল হাওয়ার দাপট আরও বেড়ে যায়। কুয়াশার কারণে দিনের বড় একটি অংশ সূর্যের আলো দেখা যায়নি, ফলে দিনের বেলাতেও শীতের আমেজ বজায় ছিল। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে ভোরে ও রাতে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়তে পারে, যা যানবাহন চলাচলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই শীত সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষদের। রাজধানীর কাওরান বাজার, ফার্মগেট, বাংলামোটর, প্রেসক্লাব, পল্টন ও গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর অনেক হতদরিদ্র মানুষকে শীতে জবুথবু অবস্থায় রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখা গেছে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে আরও কষ্টকর। ফুটপাতের দোকানদার, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ অসংখ্য মানুষ শীতের কারণে কাজ করতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে হঠাৎ করে শীতের প্রকোপ বাড়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শীতের কাপড়ের দোকান ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সোয়েটার, জ্যাকেট, চাদর ও কম্বলের চাহিদা বেড়েছে। অনেক মানুষ আগেভাগে প্রস্তুতি না নেওয়ায় হঠাৎ শীত পড়তেই শীতবস্ত্র কিনতে ছুটছেন দোকানে দোকানে।
কারওয়ান বাজার এলাকার একটি মসজিদের সামনে ফুটপাতের ব্যবসায়ী আলী আহসান বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে শীতের অনুভূতি বাড়ায় তার দোকানে ক্রেতাদের ভিড় আগের তুলনায় বেড়েছে। তিনি জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় বিক্রিও কিছুটা ভালো হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, শীত বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষদের কষ্টও বাড়ে, কারণ সবার পক্ষে প্রয়োজনীয় শীতের কাপড় কেনা সম্ভব হয় না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশের কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে গণ্য হয়। একইভাবে ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বর্তমানে দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ নেই। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় মানুষ যে তীব্র শীত অনুভব করছে, তার পেছনে রয়েছে কুয়াশা, বাতাসের দিক ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শীতের এই ধারা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে বিভিন্ন মহলে।