নির্বাচনের পথচলায় দ্বিধায় বিএনপি? সমঝোতার রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার ছায়া

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৩ বার
নির্বাচনের পথচলায় দ্বিধায় বিএনপি? সমঝোতার রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার ছায়া

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই বিভক্ত ও জটিল হয়ে উঠছে। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হলেও, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নানা দলের ভিন্নমুখী অবস্থান ও দাবি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বিএনপি থেকে শুরু করে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কিংবা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—সব রাজনৈতিক দলই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছে, তবে সমন্বিত ঐক্য এখনো অধরা। প্রশ্ন উঠছে—এই দ্বিধা ও বৈপরীত্যের মাঝে বিএনপি কি আদৌ নির্বাচনের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী? নাকি তাদের মাঝেও সংশয়ের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে?

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নির্বাচনের সময়সূচি ও কাঠামোগত সংস্কার। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হলেও, নির্বাচন প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক ও ভিন্নমত থামেনি। বিএনপি একদিকে রোজার আগেই নির্বাচন চায় বলে ঘোষণা দিয়ে এসেছে, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে ও মৌলিক সংস্কার সম্পন্ন করার দাবিতে অনড়। এই দাবি সমর্থন করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরও কিছু দল, যা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে প্রকাশ করে।

বিএনপি অনেকটা সময় ধরে নির্বাচনকালীন সরকারের রোডম্যাপ দাবি করে আসছিল। প্রধান উপদেষ্টা যখন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচনের সময়সীমার কথা বলেন, তখন বিএনপি সেই সময়সীমার মধ্যেই ডিসেম্বরকে বেছে নিতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য নির্বাচনের প্রতি কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখানো হলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে দলটির মধ্যে একটি দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিদ্যমান বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বক্তব্য বারবার পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতে তারা জুন পর্যন্ত যেকোনো সময় নির্বাচন মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও এখন তারা স্পষ্ট করে বলছে, আগে স্থানীয় নির্বাচন ও জুলাই অভ্যুত্থানের দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে। এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ যশোরে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, এই দাবি বাস্তবায়ন না হলে তারা নির্বাচন বর্জন করবে এবং আবারো গণঅভ্যুত্থানের পথে হাঁটবে। এমন ঘোষণা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তুলেছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে অবশ্য বারবার বলা হচ্ছে যে, তারা সংস্কারের প্রশ্নে যৌক্তিক সমঝোতার পক্ষে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “সত্তর অনুচ্ছেদ কি কোনো ঠুনকো বিষয়? প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ কি গুরুত্বহীন? এসব ইস্যুতে আমরা একাধিক প্রস্তাব দিয়েছি, একমত হয়েছি।” তার মতে, সব দলের সব দাবি নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া যৌক্তিক নয় এবং সেটি সরকারের ভারসাম্য রক্ষার পথেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

তবে একইসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই মুহূর্তে চলমান বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য রাজনৈতিক দর কষাকষির অংশ এবং আলোচনার টেবিলে এসব দল অনেক সময়েই ভিন্ন অবস্থান নেয়। তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিএনপি পরিস্থিতির গতি ও সমঝোতার সম্ভাব্যতাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না, তবে এককভাবে কোনো পক্ষের শর্ত মেনে নেওয়ার পক্ষে তারা নয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—বিএনপির কি সত্যিই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আস্থা আছে? নাকি তারা অন্য দলগুলোর মতোই সংশয়ে ভুগছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি প্রকাশ্যে দ্বিধাহীন থাকলেও বিভিন্ন মহলের চাপ, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সংস্কার প্রশ্নে ভিন্নমত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতের মতো দলগুলোর অবস্থান নির্বাচনকালীন ঐক্যজোটকে দুর্বল করছে।

একদিকে নির্বাচনের সময়সূচি, অন্যদিকে মৌলিক সংস্কার, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ইত্যাদি ইস্যুকে সামনে এনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছে। কিন্তু একে অপরের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যা সমন্বিত কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পথকেই সংকুচিত করছে।

এই বাস্তবতায় দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। দলটি যদি এখনই এই অনিশ্চয়তা দূর করে একটি সুস্পষ্ট কৌশল গ্রহণ না করে, তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ঐক্যের ঘাটতি আসন্ন নির্বাচনে বড় ধরনের অংশগ্রহণ সংকট তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অতএব, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সংশয়, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বও ততই প্রকট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও জনগণের আস্থার প্রতিফলন—তা না হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনও হয়ে উঠতে পারে আরও একটি বিতর্কিত অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত