প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আলজেরিয়ার ফুটবল মানেই এক নাম—রিয়াদ মাহরেজ। ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিজেকে প্রমাণ করা এই তারকা বছরের পর বছর ধরে আলজেরিয়ান ফুটবলের প্রতীক হয়ে আছেন। জাতীয় দলের সংকটে, বড় মঞ্চে কিংবা কঠিন মুহূর্তে—দলের ভরসার জায়গাটা বারবারই এসে পড়ে মাহরেজের কাঁধে। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের মঞ্চে আবারও সেটিই প্রমাণ করলেন তিনি। জোড়া গোল করে শুধু দলকে জেতালেনই না, গড়লেন নতুন ইতিহাস। সুদানের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে আলজেরিয়ার নায়ক হয়ে ওঠার পাশাপাশি আফকনে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদাও নিজের করে নিলেন মাহরেজ।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ই–এর উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল আলজেরিয়ার নিয়ন্ত্রণে। মাঠে নামার আগেই দুই দলের শক্তি ও অভিজ্ঞতার ব্যবধান স্পষ্ট ছিল। তবে ম্যাচের শুরুতেই সেই পার্থক্য আরও পরিষ্কার করে দেন মাহরেজ। খেলার শুরুতেই তার করা গোল আলজেরিয়াকে এনে দেয় আদর্শ সূচনা। আক্রমণে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, মাঝমাঠে দখল শক্ত হয়, আর প্রতিপক্ষ সুদান পড়ে যায় চাপে। এই দ্রুত লিড ম্যাচের গতিপথ অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধেও আলজেরিয়া নিজেদের পরিকল্পনায় অবিচল থাকে। সুদান কিছুটা রক্ষণ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও আলজেরিয়ার আক্রমণভাগ ছিল ধারালো। ম্যাচের ৬১তম মিনিটে আবারও দৃশ্যপটে মাহরেজ। মোহাম্মদ আমুরার নিখুঁত থ্রু-পাস ধরে বক্সের ভেতরে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠান ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। অভিজ্ঞতা আর ক্লাসের দারুণ মিশেল দেখা যায় এই গোলটিতে। এটি শুধু ম্যাচে আলজেরিয়ার ব্যবধান বাড়ায়নি, বরং মাহরেজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারেও যোগ করেছে নতুন অধ্যায়।
আলজেরিয়ার তৃতীয় গোলটি আসে ম্যাচের শেষদিকে। ম্যাচের পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে বাগদাদ বুনেজাহর হেড ছয় গজ বক্সের একটু বাইরে এসে পড়ে ইব্রাহিম মাজারের সামনে। সুযোগ হাতছাড়া করেননি তিনি। জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে নিশ্চিত করেন আলজেরিয়ার বড় জয়। এই গোলের মাধ্যমে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে আলজেরিয়ার শততম গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করে দলটি। ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয় এই মুহূর্ত।
তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মাহরেজই। এই জোড়া গোলের মাধ্যমে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে আলজেরিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। তার নামের পাশে এখন আটটি গোল। এতদিন এই রেকর্ড নিয়ে আলোচনা থাকলেও, মাঠে নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সব প্রশ্নের জবাব দিলেন মাহরেজ। ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠে শোনা যায় আত্মবিশ্বাসী অথচ পরিমিত প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, এটি কোনো সমালোচনার জবাব দেওয়ার বিষয় ছিল না। সমালোচনার সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত। তার একমাত্র উত্তর মাঠে নিজের খেলায় মনোযোগ দেওয়া। দলের পরিকল্পনা পরিষ্কার ছিল—অতিরিক্ত কিছু না ভেবে এই ম্যাচ এবং গ্রুপের বাকি ম্যাচগুলো জিতে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
মাহরেজের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আলজেরিয়ার মানসিকতা। তারা শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকান ফুটবলে আলজেরিয়া নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে আফ্রিকা কাপ জয়ের পর দলটি বারবার প্রমাণ করেছে, তারা বড় মঞ্চে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। এই ম্যাচেও সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপ ছিল স্পষ্ট।
এই জয়ের ফলে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে গ্রুপ ই–এর শীর্ষে উঠেছে আলজেরিয়া। একই দিনে অনুষ্ঠিত অন্য ম্যাচে বুরকিনা ফাসো ২–১ গোলে ইকুয়েটোরিয়াল গিনিকে হারায়। ফলে গ্রুপের সমীকরণে আলজেরিয়া কিছুটা এগিয়ে গেল। পরবর্তী ম্যাচে রোববার মরক্কোর রাজধানীতেই বুরকিনা ফাসোর মুখোমুখি হবে আলজেরিয়া। সেই ম্যাচটি গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মাহরেজের পারফরম্যান্স আলজেরিয়ার জন্য শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং পুরো দলের জন্য এক ধরনের বার্তা। বয়স ৩৪ হলেও তার ফিটনেস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং বড় ম্যাচের মানসিকতা এখনও অটুট। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলে অর্জিত অভিজ্ঞতা তিনি নিঃসন্দেহে জাতীয় দলের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মাঠে তার উপস্থিতিই অনেক সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক তৈরি করে।
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের মতো প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যই সবচেয়ে বড় বিষয়। মাহরেজ সেটিই বারবার জোর দিয়ে বলেন। তার কাছে এই আট গোলের রেকর্ডের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া। তবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা হয়ে যাওয়াটা যে আলজেরিয়ান ফুটবলের জন্য গর্বের, তা বলাই বাহুল্য।
সব মিলিয়ে, সুদানের বিপক্ষে এই জয় আলজেরিয়ার টুর্নামেন্ট শুরুটা করেছে দারুণভাবে। আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা আর পরিকল্পনার সমন্বয়ে তারা নিজেদের শক্তি জানান দিয়েছে। আর এই যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রিয়াদ মাহরেজ—যিনি গোল করে, রেকর্ড গড়ে এবং নেতৃত্ব দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন, আলজেরিয়ার ফুটবল মানচিত্রে তিনি কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ।