প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ ৬ হাজার ৩শ ১৪ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্বপরিবারে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রায় ১৭ বছর পর মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখা এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজধানীজুড়ে দেখা গেছে ব্যাপক প্রস্তুতি, উৎসুক দৃষ্টি ও আবেগঘন পরিবেশ। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি একটি বাসে করেই তিনি যাবেন নির্ধারিত সংবর্ধনা মঞ্চে—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’। বাসটির সামনে লেখা রয়েছে দলের শ্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালের সামনে আগেই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে লাল রঙের একটি বাস। বাসটির গায়ে বড় অক্ষরে লেখা শ্লোগান, সাজানো হয়েছে দলীয় রং ও প্রতীকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে নেমে সরাসরি এই বাসে করেই তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে রওনা হবেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিবেচনায় এই যাত্রাপথ আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২০২ ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় এবং দুপুর পৌনে ১২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর আগে বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারে পরিচালিত ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এছাড়া সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তারেক রহমানের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ, ব্যক্তিগত সহকারী রহমান সানি ও তাবাসসুম ফারহানা। ফ্লাইট ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার ঘণ্টা আগে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে তারা বাসা থেকে বের হন এবং বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পর তারেক রহমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সেখানে তিনি দেশে ফেরার অনুভূতি প্রকাশ করেন এবং সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পোস্টটি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করে। বিমান অবতরণের আগেই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ভরে ওঠে সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো।
এদিকে তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সকাল থেকেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। রাজধানীসহ আশপাশের জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে মিলিত হয় নির্ধারিত স্থানে। অনেকেই হাতে দলীয় পতাকা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে সরাসরি নেতাকর্মীদের সামনে আসা দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের রাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন তারা। তবে বিশ্লেষকরা এটিও বলছেন, সামনে জাতীয় রাজনীতিতে কী ধরনের কৌশল ও কর্মসূচি নেয় বিএনপি—সেটিই এই প্রত্যাবর্তনের বাস্তব প্রভাব নির্ধারণ করবে।
দলীয় সূত্র জানায়, সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলতে পারেন। যদিও বক্তব্যের বিস্তারিত আগাম জানানো হয়নি, তবে দলের ভেতরে এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা উত্থান-পতন। দীর্ঘ প্রবাসজীবন, আইনি জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই দেশে ফেরা তার ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমর্থকদের চোখে এটি প্রত্যাবর্তনের দিন, আর সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ।
বিমানবন্দর থেকে বাসে করে সংবর্ধনা মঞ্চে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি প্রতীকী বলেও মনে করছেন অনেকে। দলীয় নেতারা বলছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ এবং দলীয় শ্লোগানের প্রতিফলন ঘটাতেই এই আয়োজন। বাসের সামনে লেখা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই বার্তাটি দলের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২৫ ডিসেম্বরের এই দিনটি বিএনপির রাজনীতিতে একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা ঘিরে যে আবেগ, প্রত্যাশা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব আগামী দিনের রাজনীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হবে—সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।