প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বরিশালের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য আন্দোলন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার হুমকি—সব মিলিয়ে বরিশালে বিএনপি এখন স্পষ্টতই চাপে। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া), বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী), বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) এবং বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুর প্রায় একই। অভিযোগগুলোতে বলা হচ্ছে, মনোনীত অনেক প্রার্থী অতীতে দলের দুঃসময়ে এলাকায় ছিলেন না, আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াননি এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোথাও কোথাও অতীতের ঘটনাকে সামনে এনে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও তোলা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
বরিশাল-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দীন স্বপন। তার মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই এ আসনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমানের সমর্থকরা। আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী উপজেলায় তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে একাধিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশও প্রকাশ্যে আন্দোলনে নেমেছে। তাদের অভিযোগ, ২০০১ সালে স্বপন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সময় এ এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলে অনেক মানুষ আতঙ্কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ স্বপনের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। অপরদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, সেই সময়ে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এ কারণে তারা সোবাহানকেই মনোনয়ন দেওয়ার দাবি তুলছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে সোবাহানের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
বরিশাল-৩ আসনেও চিত্র অনেকটা একই রকম। এখানে বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবেদীনের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে সরব হয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং মুলাদী উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস সত্তার খান। তাদের সমর্থকেরা ইতোমধ্যে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং মশাল মিছিল করেছেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, জয়নুল আবেদীন একজন জনবিচ্ছিন্ন নেতা এবং অতীতের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।
সেলিমা রহমানের সমর্থকেরা দাবি করছেন, তিনি অতীতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সময় মাঠে থেকে আন্দোলন করেছেন। অন্যদিকে আব্দুস সত্তার খানও নিজেকে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, প্রার্থী পরিবর্তন না হলে জনগণের চাপে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
বরিশাল-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান। তার মনোনয়ন ঘিরে বিক্ষোভে নেমেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দীন ফরহাদের সমর্থকেরা। ফরহাদের বক্তব্য, তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের সময়ে এলাকায় অবস্থান করে নেতাকর্মীদের সঙ্গে থেকেছেন এবং হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। অথচ যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, তিনি দীর্ঘ সময় এলাকায় অনুপস্থিত ছিলেন—এমন অভিযোগ তুলে নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
বরিশাল-৫ আসনেও পরিস্থিতি কম উত্তপ্ত নয়। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার। তবে কেন্দ্রীয় নেতা আবু নাছের মো. রহমাতুল্লাহ এবং মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাছরিন এখনো মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারা আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করছেন এবং নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছেন। ১৪ ডিসেম্বর একটি কর্মসূচিতে সরোয়ারের সমর্থকদের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে নাছরিনের বিরুদ্ধে, যা দলীয় বিরোধকে আরও উসকে দিয়েছে।
এই চারটি আসনেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ একটি বড় অংশের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই অন্তর্দ্বন্দ্ব নির্বাচনি অঙ্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূলে ক্ষোভ প্রশমিত না হলে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর সম্ভাবনা যেমন বাড়বে, তেমনি ভোট বিভাজনের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছে ইসলামী ঐক্যজোটসহ সমমনা ইসলামী দলগুলোর প্রার্থীরা। তারা বিএনপির দুর্বলতা ও বিভক্তির সুযোগ নিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রচারে সাড়া মিলছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বরিশালের চার আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে নিজেদের দলে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ সামাল দেওয়া, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর শক্তিশালী প্রচার মোকাবিলা—এই দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামলানো সহজ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং তৃণমূলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে বরিশালে বিএনপির নির্বাচনি ভবিষ্যৎ।