প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার ৩০০ ফিট সড়ক, যা জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে নামেও পরিচিত, সেখানে নির্ধারিত সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেল প্রায় ৪টার দিকে তিনি সেখানে পৌঁছান। এ সময় সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেওয়া দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্বাগত জানান। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, আবেগ ও প্রত্যাশার সমন্বয়ে মুহূর্তটি পরিণত হয় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় দৃশ্যে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তার দেশে ফেরা ঘিরে বিমানবন্দর এলাকায় ছিল কড়া নিরাপত্তা ও কঠোর নজরদারি। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং পরিবারের আদরের পোষা বিড়াল ‘জেবু’। এই যাত্রা শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক দিক থেকেও ছিল আবেগঘন—একটি পরিবারের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য অনেকের চোখে জল এনে দেয়।
বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত যাত্রাপথজুড়ে ছিল ব্যাপক জনসমাগম। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দলীয় পতাকা নেড়ে, স্লোগান দিয়ে এবং করতালির মাধ্যমে তাদের নেতাকে অভ্যর্থনা জানান। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন, কেউ কেউ দূরদূরান্ত থেকে ভ্রমণ করে ঢাকায় পৌঁছান শুধু এক নজর প্রিয় নেতাকে দেখার আশায়। পথের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে ছোট ছোট সমাবেশ, যা যাত্রাকে ধীরগতির করে তোলে, তবে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
তারেক রহমানের যাত্রাবিরতি ও নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিমানবন্দর সংলগ্ন সড়কগুলোতে স্থাপন করা হয় বিশেষ চেকপোস্ট, বাড়ানো হয় গোয়েন্দা নজরদারি। ঢাকায় প্রবেশের পরও পুরো যাত্রাপথে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল দৃশ্যমান, তবে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।
সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই তারেক রহমানকে ঘিরে আবেগের বহিঃপ্রকাশ আরও তীব্র হয়। মঞ্চের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে পরিবেশ মুখর করে তোলেন। অনেকের হাতে ছিল ব্যানার ও ফেস্টুন, যেখানে লেখা ছিল স্বাগত ও শুভেচ্ছার বার্তা। বিএনপির পক্ষ থেকে এই সংবর্ধনাকে ‘ঐতিহাসিক’ করে তুলতে আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। দলীয় সূত্রে জানা যায়, শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখ লাখ মানুষ এই আয়োজনে অংশ নিতে রাজধানীতে এসেছেন।
বিএনপির নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য নতুন প্রেরণা ও সংগঠনিক শক্তি এনে দেবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে থেকেও তিনি দলীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন বলে তারা দাবি করেন। তবে সরাসরি মাঠের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি আন্দোলন ও কর্মসূচিকে আরও গতিশীল করবে—এমন প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের কণ্ঠে স্পষ্ট। অনেকেই মনে করছেন, এই সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের জনসমর্থনের শক্ত বার্তা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সংবর্ধনাস্থলের এই জনসমাগম কেবল একটি দলীয় আয়োজন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক আবহে একটি বড় ঘটনা। দীর্ঘ প্রবাস শেষে একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার প্রত্যাবর্তন সাধারণত নানা প্রশ্ন ও প্রত্যাশা তৈরি করে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সেটি আরও তীব্র, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তব্য, রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাই নির্ধারণ করবে এই প্রত্যাবর্তনের প্রকৃত প্রভাব।
মানবিক দিক থেকেও এই ঘটনা অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর পরিবারসহ দেশে ফেরা, পথে পথে মানুষের ভালোবাসা—সব মিলিয়ে এটি এক ব্যক্তির জীবনের বড় মুহূর্ত। তারেক রহমানের সঙ্গে থাকা তার পরিবারকেও অনেকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিমানবন্দর থেকে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত যাত্রার নানা ছবি ও ভিডিও, যেখানে মানুষের আবেগ ও উচ্ছ্বাস স্পষ্ট।
সংবর্ধনা আয়োজন ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ছিল সমন্বিত প্রস্তুতি। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বেষ্টনী ও জরুরি সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, জনসমাগম বড় হলেও পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ছিল, যা ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংবর্ধনাস্থলে তারেক রহমানের পৌঁছানো শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে একটি আলোচিত ও আবেগঘন অধ্যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং দলীয় শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এই দিনটি অনেকের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকবে। এখন সবার দৃষ্টি তার পরবর্তী বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং তিনি কীভাবে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন—সেই দিকেই নিবদ্ধ।