বালিয়াকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল বৃদ্ধের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮২ বার
বালিয়াকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল বৃদ্ধের

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ব্যস্ত বাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একজন বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এই বাজার এলাকার অবদার মোড় অংশে সংঘটিত দুর্ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক সকালকে শোক ও আতঙ্কে পরিণত করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তি এবং আহতরা সবাই একই ভ্যানে করে বাজারের দিকে আসছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে নারুয়া এলাকা থেকে একটি ভ্যানে করে কয়েকজন যাত্রী বালিয়াকান্দি বাজারে যাচ্ছিলেন। ভ্যানটি অবদার মোড় এলাকায় পৌঁছামাত্রই পেছন দিক থেকে একটি মাহিন্দ্রা গাড়ি দ্রুতগতিতে এসে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ভ্যানটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং যাত্রীরা ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন সদর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর মন্ডল (৭০)। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও তিনি ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।

নিহত লুৎফর মন্ডল ছিলেন মৃত গনি মন্ডলের ছেলে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, তিনি একজন সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ছিলেন এবং নিয়মিত প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বাজারে যাতায়াত করতেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন, অনেকের চোখে দেখা যায় কান্না আর হতবাক দৃষ্টি।

এই দুর্ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। তারা হলেন একই গ্রামের কিয়ামদ্দিনের ছেলে রুহুল সরদার (৬০), রহিম শেখের ছেলে নাদের শেখ (৭৫) এবং সাদেক আলীর ছেলে আব্দুস সালাম শেখ (৫৫)। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করেন এবং বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। আহতদের মধ্যে রুহুল সরদার ও নাদের শেখের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অপর আহত আব্দুস সালাম শেখকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফারুক হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় একজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয় এবং তিনজন আহত অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে দুইজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ফরিদপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে।

দুর্ঘটনার পর বালিয়াকান্দি বাজার এলাকায় কিছু সময়ের জন্য যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ভিড় জমালে পরিস্থিতি কিছুটা অস্থির হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করে। দুর্ঘটনাকবলিত ভ্যান ও মাহিন্দ্রাটি রাস্তার একপাশে সরিয়ে নেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবদার মোড় এলাকায় প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এই এলাকায় রাস্তার বাঁক, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং অনেক চালকের বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে বাজারের দিনগুলোতে ভ্যান, মাহিন্দ্রা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভিড় থাকে বেশি। তদারকি ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এমন দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুর্ঘটনা আরও বেদনাদায়ক, কারণ নিহত ও আহতরা সবাই বয়সে প্রবীণ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্যই গভীর শোকের বিষয়। স্থানীয় মসজিদে নিহত লুৎফর মন্ডলের জন্য দোয়া আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাহিন্দ্রা গাড়িটির চালকের গতি এবং চালনার ধরন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গাড়িটি দ্রুতগতিতে ছিল এবং সামনে থাকা ভ্যানটিকে সময়মতো লক্ষ্য করতে পারেনি। চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ সড়কগুলোতে এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। ভ্যান ও মাহিন্দ্রার মতো যানবাহনগুলোতে অনেক সময় যাত্রী ও পণ্য একসঙ্গে বহন করা হয়, যা ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থার দুর্বলতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তারা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত ট্রাফিক তদারকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বালিয়াকান্দি উপজেলার সাধারণ মানুষও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত নয়, বরং আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অবদার মোড় এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রণ, স্পিড ব্রেকার স্থাপন এবং ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের দাবি উঠেছে।

সব মিলিয়ে, বালিয়াকান্দির এই সড়ক দুর্ঘটনা আবারও গ্রামীণ সড়কে নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে। একটি মুহূর্তের অসতর্কতা বা বেপরোয়া গতি কেড়ে নিল একটি প্রাণ এবং আহত করল আরও তিনজনকে। নিহত লুৎফর মন্ডলের পরিবারের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়, আর আহতদের জন্য সামনে রয়েছে অনিশ্চিত সুস্থতার পথ। এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে—এ প্রত্যাশাই এখন এলাকাবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত