প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বছর শেষ মানেই কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়া নয়; এটি মানুষের জীবনের আরেকটি অধ্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার নীরব ঘোষণা। প্রতিটি বিদায়ী বছর আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় একটি গভীর বাস্তবতা—মানুষের জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, অথচ এই সীমিত সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ফয়সালা হয়ে যায়। ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতে, একজন মুমিনের কাছে সময় কোনো সাধারণ প্রবাহ নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্ত আমানত, যার হিসাব একদিন দিতে হবে। এই উপলব্ধিই বছরশেষে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে আত্মসমালোচনা বা মুহাসাবা আত্মশুদ্ধির প্রথম ও অপরিহার্য ধাপ। বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ যখন নিজের অতীত দিনের দিকে ফিরে তাকায়, তখন তার সামনে ভেসে ওঠে ইবাদতে গাফিলতি, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা মানুষের হক নষ্ট করার স্মৃতি। আলেমরা বলেন, আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে খাঁটি অন্তর থেকে তওবা করা এবং বান্দার হকের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া—এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া তওবা পূর্ণতা পায় না। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বারবার আল্লাহর ক্ষমাশীলতার কথা বলা হয়েছে, তবে সেই ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো অনুশোচনা, গুনাহ পরিত্যাগের দৃঢ় সংকল্প এবং ভবিষ্যতে সংশোধিত জীবনের প্রতিশ্রুতি।
বছরশেষে আত্মশুদ্ধির আলোচনায় নফস ও শয়তানের প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইসলামী শিক্ষায় শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও নফসকে বলা হয় গোপন শত্রু, যা মানুষকে ভেতর থেকেই দুর্বল করে তোলে। নফসের প্রবৃত্তি মানুষকে তাৎক্ষণিক সুখ ও লালসার দিকে টানে, আর শয়তান সেই প্রবণতাকে কুমন্ত্রণার মাধ্যমে উসকে দেয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শয়তানের প্রলোভন থেকে বাঁচার চেষ্টা যথেষ্ট নয়; বরং নফসের নিয়মিত প্রশিক্ষণ জরুরি। নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ—এসবই নফসকে শুদ্ধ ও শক্তিশালী করার কার্যকর উপায়।
সময়ের সঠিক ব্যবহার ও সৎ সঙ্গের গুরুত্বও বছরশেষের আলোচনায় বারবার উঠে আসে। মানুষের জীবনগঠনে সঙ্গের প্রভাব যে কতটা গভীর, তা সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় চিন্তাবিদ উভয়েই স্বীকার করেন। সৎ সঙ্গ মানুষকে গাফিলতি থেকে রক্ষা করে, সময়ের মূল্য শেখায় এবং আখিরাতমুখী জীবনযাপনে অনুপ্রেরণা জোগায়। বিপরীতে অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে মানুষকে লক্ষ্যচ্যুত করে ফেলে, নষ্ট করে ফেলে অমূল্য সময়। তাই বছর শেষে নিজের সামাজিক পরিসর নতুন করে মূল্যায়ন করাও আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের মহামানবদের জীবন, যাদের সালাফে সালেহিন বলা হয়, সময় ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সীমিত সামর্থ্য ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের জীবনে ছিল শৃঙ্খলা, ভারসাম্য ও দৃঢ় সংকল্প। ধর্মীয় গবেষকদের মতে, সালাফদের জীবনচর্চা অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়—অসাধারণ সাফল্যের জন্য কেবল প্রতিভা নয়, বরং ধারাবাহিক চেষ্টা ও সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনাই মূল চাবিকাঠি।
সুস্থতা ও জীবনের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কেও ইসলামী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, রোগ আসার আগে সুস্থতা এবং মৃত্যুর আগে জীবন—এই দুটি অমূল্য নিয়ামত মানুষ প্রায়ই অবহেলা করে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.)-এর বাণী, ‘সন্ধ্যা হলে সকালের অপেক্ষা করো না, আর সকাল হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না’—এই কথার তাৎপর্য হলো কাজ পিছিয়ে না দেওয়া এবং বর্তমান সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো। বছরশেষে দাঁড়িয়ে এই শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবন ও সুস্থতা অনিশ্চিত; তাই সুযোগ থাকা অবস্থায়ই সৎকর্মে মনোযোগী হওয়া বুদ্ধিমানের।
মৃত্যুচিন্তা ইসলামী দর্শনে আত্মশুদ্ধির এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। মৃত্যুর স্মরণ হৃদয়কে নরম করে, দুনিয়ার মোহ কমায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে—কীভাবে সে সময় অতিবাহিত করেছে। এই উপলব্ধি বছরশেষে মানুষকে নিজের সময় ব্যবহারের হিসাব নিতে বাধ্য করে। আলেমদের মতে, মৃত্যু স্মরণ মানেই হতাশা নয়; বরং এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলার প্রেরণা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময়ের শপথ করেছেন—রাত, দিন, ফজর ও আসরের। ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারদের মতে, এই শপথের মাধ্যমে সময়ের গুরুত্ব মানুষের কাছে সুস্পষ্ট করা হয়েছে। সময়ের অপচয় কেবল দুনিয়ার ক্ষতিই নয়; এটি আখিরাতের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ। বছরশেষে এই বার্তাই নতুন করে উচ্চারিত হয় যে, প্রতিটি অতিবাহিত মুহূর্ত একদিন মানুষের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে।
নববর্ষকে ঘিরে আধুনিক সমাজে আনন্দোৎসবের প্রবণতা বাড়লেও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, নতুন বছরের প্রকৃত তাৎপর্য উৎসবে নয়, আত্মসমালোচনায়। একটি বছর পার হওয়া মানে জীবনের একটি বছর কমে যাওয়া এবং মৃত্যুর আরও কাছে পৌঁছে যাওয়া। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে নিছক আনন্দের বদলে আত্মসংযম ও সংশোধনের তাগিদ অনুভূত হওয়াই স্বাভাবিক। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, ‘তোমরা যদি সেই বাস্তবতা জানতে, যা আমি জানি, তবে কম হাসতে ও বেশি কাঁদতে’—এই হাদিস গাফিলতির পর্দা সরিয়ে জীবনের প্রকৃত চিত্র সামনে আনে।
সব মিলিয়ে বছরশেষ ইসলামী চিন্তায় একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সময়। তওবা, আত্মসমালোচনা, সময়ের সদ্ব্যবহার এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অঙ্গীকার—এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত বলে মনে করেন আলেম ও বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আত্মশুদ্ধির এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই একজন মুমিনের জীবনে প্রকৃত সাফল্য বয়ে আনতে পারে। ইনশাআল্লাহ, এই উপলব্ধি নিয়ে নতুন বছরে প্রবেশ করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা যায়।