শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা, তাপমাত্রা নেমেছে ৯.৬ ডিগ্রিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গা, তাপমাত্রা নেমেছে ৯.৬ ডিগ্রিতে

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গায় শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। উত্তরের হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশার দাপটে সীমান্তবর্তী এই জেলায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রির নিচে। শুক্রবার সকালে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন। কনকনে শীতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বয়স্করা।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ১১ নভেম্বর থেকেই চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে এসে সেই শীত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, শুক্রবার ভোর ৬টায় জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সে সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। সকাল ৯টায় সূর্যের আলো কিছুটা দেখা গেলেও তাপমাত্রা আরও কমে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে এবং আর্দ্রতা অপরিবর্তিত থাকে। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে প্রায় দুই ডিগ্রি তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শীতের প্রকোপ হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরের হিমেল বাতাস অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনেও তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমতে পারে। ফলে জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শীতের এই দাপটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, ভ্যানচালক, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের মানুষ। শহরের শান্তিপাড়ার পথচারী রফিকুর রহমান বলেন, কয়েক দিন ধরে শীত অনেক বেশি পড়ছে। সকালে কাজে বের হতে কষ্ট হচ্ছে। শীতের কারণে অনেক জায়গায় কাজ কমে গেছে। কাজের সন্ধানে বের হয়ে অনেকে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। এতে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেছে।

রিকশাচালক আবুল কাশেম জানান, ভোর ও সকালে শীত এতটাই বেশি থাকে যে শহরের রাস্তায় লোকজন কম বের হয়। যাত্রী না থাকায় আয় প্রায় বন্ধের পথে। তিনি বলেন, “সকালে রিকশা নিয়ে বের হলেও যাত্রী পাই না। লোকজন শীতের ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এমন চলতে থাকলে আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।”

শীতের প্রভাব পড়েছে গ্রামাঞ্চলেও। ভোরের কুয়াশা আর ঠান্ডায় কৃষি কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মাঠে কাজ করা শ্রমিকরা সকালবেলা কাজে নামতে পারছেন না। অনেক কৃষক জানান, সূর্য ওঠার পরও ঠান্ডা কমছে না, ফলে কাজের সময় কমে যাচ্ছে। এতে দৈনিক আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্ক মানুষ। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি। তাই তাদের উষ্ণ রাখতে এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

গ্রামগঞ্জের চিত্র আরও করুণ। অনেক দরিদ্র পরিবার এখনও পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র পায়নি। ফলে খড়কুটো, কাঠ বা শুকনো পাতা জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ভোরের দিকে খোলা আকাশের নিচে আগুন জ্বালিয়ে মানুষজন গা গরম করার চেষ্টা করছেন। এতে শীত থেকে সাময়িক স্বস্তি মিললেও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, তাপমাত্রা আরও কমলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যাবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য উষ্ণ কাপড় ও কম্বল জরুরি হয়ে উঠেছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুয়াডাঙ্গা ভৌগোলিকভাবে সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে শীত সাধারণত দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি অনুভূত হয়। উত্তরের শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস সহজেই এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে এখানকার তাপমাত্রা প্রায়ই ৮ থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে। চলতি মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

শহরের সাধারণ মানুষ বলছেন, শীত মোকাবিলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা জরুরি। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইতোমধ্যে শীতবস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শীতবস্ত্র বিতরণ জোরদার করার দাবি উঠেছে।

সব মিলিয়ে, চুয়াডাঙ্গায় চলমান শৈত্যপ্রবাহ শুধু আবহাওয়ার একটি ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কর্মহীনতা, আয় হ্রাস, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক সংকট—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামনে আরও কয়েক দিন শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে। তাই সময় থাকতেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত