প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন–২০২৫ শুরু হয়েছে। শুক্রবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সারাদেশ থেকে আগত প্রায় ছয় হাজারের বেশি সদস্যের অংশগ্রহণে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মেলনের সূচনা হয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়েই ২০২৬ মেয়াদের জন্য নতুন কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হবেন। ফলে সম্মেলনকে ঘিরে ছাত্র রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার আবহ।
দলীয় সূত্র জানায়, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ায় এবং সাংগঠনিক জীবনের একটি পর্যায় পূর্ণ করায় বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি শিবিরের রাজনীতিতে আর সক্রিয় থাকতে আগ্রহী নন বলে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মহলে জানা গেছে। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া আরও গুরুত্ব পেয়েছে এবং সম্মেলনের মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—কে হচ্ছেন পরবর্তী সভাপতি।
ছাত্রশিবিরের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সারা দেশ থেকে আগত সদস্যদের সরাসরি ও গোপন ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সভাপতি তার পছন্দ অনুযায়ী একজনকে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত করেন। এই প্রক্রিয়াকে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখানো হয়। ফলে এবারের সম্মেলনেও ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাইকে ঘিরে সদস্যদের মধ্যে আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
সম্মেলন শুরুর আগ থেকেই সভাপতি পদে একাধিক শীর্ষ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে সবচেয়ে বেশি যে নামটি শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন বর্তমান কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় যোগাযোগ এবং শিবিরের নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যায় তার ভূমিকার কারণে তিনি অনেকের কাছেই স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি সিবগাতুল্লাহ। সাংগঠনিক দক্ষতা ও ছাত্র রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে তার নামও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ এবং কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে সাদিক কায়েম তরুণ সদস্যদের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সংগঠনটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে সাধারণত সেক্রেটারি জেনারেলই পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। অতীতের নেতৃত্ব কাঠামোতে এই ধারার ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা গেছে। সে কারণেই অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এবারও সেই রীতির বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই বাস্তবতায় বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দামকেই নতুন কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
সংগঠনসংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে সভাপতি নির্বাচনের পর আলোচনায় থাকা অন্য নেতাদের মধ্য থেকেই একজনকে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিবগাতুল্লাহ, আজিজুর রহমান আজাদ কিংবা সাদিক কায়েমের যে কেউ সেই দায়িত্ব পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগ পর্যন্ত এসবই অনুমান ও আলোচনা পর্যায়েই থাকবে।
এবারের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন ছাত্রশিবিরের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংগঠনের নেতারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। এমন এক সময়ে সংগঠনকে নেতৃত্ব দিতে হলে প্রয়োজন মেধাবী, কৌশলী এবং সময়োপযোগী নেতৃত্ব। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করা এবং শিক্ষাঙ্গনে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই নতুন নেতৃত্বকে কাজ করতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর দেশের ছাত্র রাজনীতিতে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেটিও শিবিরের জন্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। বিভিন্ন আন্দোলন ও সামাজিক ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এ প্রেক্ষাপটে নবনির্বাচিত কমিটির অন্যতম লক্ষ্য হবে ছাত্র রাজনীতির নতুন ধারায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা এবং সংগঠনের আদর্শ ও কর্মসূচিকে সময়োপযোগীভাবে উপস্থাপন করা।
সম্মেলনে অংশ নিতে আসা অনেক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দূরদর্শিতা ও বাস্তবতাবোধকে গুরুত্ব দিতে চান। একজন প্রতিনিধি জানান, “শিবিরের সামনে এখন কেবল সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ। যে নেতৃত্ব আসবে, তাকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার কথা বুঝতে হবে এবং সেগুলো নিয়ে কথা বলার সক্ষমতা থাকতে হবে।”
সম্মেলন ঘিরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়েও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সদস্যদের নিবন্ধন, প্রবেশ ও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে সাংগঠনিক প্রতিবেদন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিগত দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হচ্ছে, যা নতুন নেতৃত্বের জন্য একটি রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন–২০২৫ শুধু একটি সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সংগঠনটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কে হচ্ছেন পরবর্তী সভাপতি—এই প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষায় যেমন সদস্যরা, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মহলও নজর রাখছে এই সম্মেলনের দিকে। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে শিবির কোন পথে এগোবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।