প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পাকিস্তানের অস্থিতিশীল সীমান্তাঞ্চল বেলুচিস্তান ও খাইবার-পাখতুনখোয়ায় পৃথক নিরাপত্তা অভিযানে মোট ১০ জন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার খবর দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এসব অভিযানে ভারতীয় মদদপুষ্ট বলে অভিযোগ থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা নিহত হয়েছে। দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, বেলুচিস্তানের কালাত জেলা এবং খাইবার-পাখতুনখোয়ার ডেরা ইসমাইল খান জেলায় নিরাপত্তা বাহিনী পৃথকভাবে অভিযান চালায়। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্যে আসে যে, এসব এলাকায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান করছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়।
ডেরা ইসমাইল খান জেলায় পরিচালিত অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের তীব্র গোলাগুলি হয়। আইএসপিআর জানায়, সংঘর্ষের এক পর্যায়ে চক্রের শীর্ষস্থানীয় নেতা দিলওয়ারসহ দুইজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। দিলওয়ার দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিলেন। বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ধরিয়ে দিতে পাকিস্তান সরকার ৪০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তার নেতৃত্বে পরিচালিত একাধিক হামলায় নিরাপত্তা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
আইএসপিআর আরও জানায়, নিহত সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
একই দিনে বেলুচিস্তানের কালাত জেলায় পরিচালিত আরেকটি বড় অভিযানে আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এই অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনী আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযানের সময় ব্যাপক গুলি বিনিময় হয় এবং সংঘর্ষের মধ্যেই আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিহত সন্ত্রাসীরা ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল, যাদের পাকিস্তানে ভারতীয় প্রক্সি হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কিছু মহল পাকিস্তানের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। যদিও ভারত এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে।
বেলুচিস্তান প্রদেশ পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং উন্নয়ন ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় অসন্তোষ, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
খাইবার-পাখতুনখোয়াও একইভাবে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি অতীতে নানা জঙ্গি সংগঠনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান সরকার ব্যাপক সামরিক অভিযান ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। তবুও বিচ্ছিন্ন কিছু হামলা ও সংঘর্ষ দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এই সর্বশেষ অভিযানের পর পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা দমন করতে সেনাবাহিনী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের অভিযান স্বল্পমেয়াদে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্ষমতা দুর্বল করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি জরুরি। বেলুচিস্তান ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
এই ঘটনাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত উভয় দেশকেই সংযম প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে থাকে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযান দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের একটি শক্ত বার্তা দিলেও এর পেছনের জটিল বাস্তবতা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এই ধরনের অভিযানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।