প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহলকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভারতের মধ্যপ্রদেশ সরকারের নগর প্রশাসন মন্ত্রী ও প্রবীণ বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়। তিনি দাবি করেছেন, আগ্রায় অবস্থিত তাজমহল আদতে একটি মন্দির ছিল, যা পরে মুঘল সম্রাট শাহজাহান সমাধিতে রূপান্তর করেন। এই মন্তব্য সামনে আসতেই ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা, সমালোচনা এবং পাল্টা যুক্তির ঢেউ উঠেছে। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বিষয়টি প্রকাশ করলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার বিনা শহরে একটি স্থানীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজয়বর্গীয় এই দাবি করেন। সেখানে তিনি বলেন, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় স্ত্রী মমতাজ মহলকে প্রথমে মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরে দাফন করা হয়েছিল। পরে তার মরদেহ এমন এক স্থানে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে একটি মন্দির নির্মাণের কাজ চলছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সেই স্থানেই পরবর্তীতে তাজমহল নির্মিত হয়। মন্ত্রীর এই বক্তব্য অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বক্তব্যের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইউটিউবে ভিডিওটি ঘিরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। সমর্থকদের একটি অংশ এই বক্তব্যকে ‘ঐতিহাসিক সত্যের পুনর্মূল্যায়ন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তাঁদের মতে, ভারতের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে একপেশে ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং তাজমহল নিয়ে নতুন গবেষণা ও বিতর্ক হওয়া উচিত। অন্যদিকে সমালোচকেরা এই মন্তব্যকে ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দেন।
ভারতের ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশ বরাবরই বলে আসছেন, তাজমহল নির্মিত হয়েছিল মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে, ১৬৩২ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে। এটি নির্মিত হয় তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে। তাজমহলের নির্মাণশৈলী, স্থাপত্যশৈলী, শিলালিপি ও ঐতিহাসিক দলিল—সবকিছুই মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইউনেস্কোও তাজমহলকে মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এমন বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে।
বিজয়বর্গীয়র বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত সামনে আসে। বিরোধী দল কংগ্রেসসহ কয়েকটি দল তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেছে, ইতিহাস বিকৃত করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, তাজমহলের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য ভারতের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছে, একজন মন্ত্রীর কাছে এমন দাবির পক্ষে কী ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে।
তবে বিজেপির ভেতর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সুর শোনা গেছে। দলের কিছু নেতা প্রকাশ্যে এই বক্তব্যের পক্ষে কথা বলতে না চাইলেও, কেউ কেউ আবার বিষয়টিকে ‘ব্যক্তিগত মতামত’ বলে উল্লেখ করেছেন। দলীয় পর্যায়ে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে এই মন্তব্য বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান নাকি ব্যক্তিগত বিশ্বাস—তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই একই অনুষ্ঠানে বিহারের মানুষদের নিয়ে করা বিজয়বর্গীয়র আরেকটি মন্তব্য নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, বিহারের কারও বিনয়ী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি নীতিন নবীন বিনয়ের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই একে বিহারের জনগণের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক রসিকতা বা বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা বলে দাবি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইতিহাস ও পরিচয়কে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা, নামকরণ এবং পাঠ্যপুস্তক নিয়ে একের পর এক বিতর্ক দেখা গেছে। তাজমহল নিয়েও অতীতে একাধিকবার বিতর্ক উসকে উঠেছে। কখনো একে ‘তেজো মহালয়’ নামে একটি প্রাচীন মন্দিরের ওপর নির্মিত বলে দাবি করা হয়েছে, আবার কখনো এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে প্রতিবারই মূলধারার ইতিহাসবিদেরা এসব দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন।
তাজমহল শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রতি বছর লাখো পর্যটক এই স্থাপনা দেখতে আগ্রায় যান। এটি ভারতের পর্যটন অর্থনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। ফলে এমন একটি স্থাপনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও ছিল বৈচিত্র্যময়। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেন এ ধরনের ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হলো। আবার কেউ বলেছেন, ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক, তবে তা হওয়া উচিত গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে, রাজনৈতিক মঞ্চে নয়।
এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি অংশ বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলছে, এই ধরনের মন্তব্য দেশটির বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামোতে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন দেশটি সামনে জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে, তখন এমন বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
তাজমহল নিয়ে বিতর্ক নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইতিহাস কেবল অতীতের গল্প নয়, বরং বর্তমান রাজনীতি ও সমাজের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। কৈলাস বিজয়বর্গীয়র বক্তব্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হবে নাকি এর পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আসবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, তাজমহলকে ঘিরে এই মন্তব্য ভারতজুড়ে আবারও ইতিহাস, রাজনীতি ও পরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতেও আলোচনায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল।