ভারতে বড়দিনে খ্রিস্টানদের ওপর ৬০টির বেশি হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
ভারতে বড়দিনে খ্রিস্টানদের ওপর ৬০টির বেশি হামলা

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বড়দিনের সময় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৬০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওপেন ডোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গির্জায় ভাংচুর, বড়দিনের সাজসজ্জা নষ্ট এবং উৎসব পালনকারী মানুষদের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার ক্ষেত্রে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর দায় প্রায়ই উঠে আসে। ভারতের ক্যাথলিক বিশপ’স কনফারেন্স এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বড়দিনের উৎসবের আগে এবং বড়দিনের দিনই বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ হয়েছে। ‘ক্রিস্টমাস ক্যারল’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী গায়ক-গায়িকাদের হেনস্তা করা, গির্জায় ধর্মীয় সভা বাধাগ্রস্ত করা এবং উৎসব পালনকারীদের উপর শারীরিক হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এসব আগ্রাসন পরিচালিত হয়েছে স্থানীয় মব বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী যুবকেরা নিয়ে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে।

মধ্যপ্রদেশের জাবালপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বিশেষভাবে নজর কাড়েছে। বড়দিনের উৎসবে অংশ নেওয়া এক দৃষ্টিশক্তিহীন খ্রিস্টান নারীকে হেনস্তা এবং মারধোর করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। ঘটনা ঘিরে বিরোধী দল কংগ্রেস এটিকে ‘বর্বরতা ও নির্মমতার উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে। স্থানীয় বিজেপি নেত্রী আঞ্জু ভারঘাভা অভিযোগ অস্বীকার করলেও পুলিশ জানায়, এখনও কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। পরে স্থানীয় বিজেপিকে শো-কজ নোটিশ জারি করতে দেখা গেছে।

ওড়িশ্যা ও দিল্লিতে বড়দিন উদযাপনকারীদের ওপর আরও দুটি ঘটনা ঘটে। সেখানে দেখা যায়, সান্তা ক্লজের ক্যাপ বিক্রি করা ব্যক্তিদের হেনস্তা করা হচ্ছে এবং বড়দিনের সাজে থাকা নারীদের ওপর আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা এসব কর্মকাণ্ডকে ‘হিন্দু দেশে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারণা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ক্যাথলিক বিশপ’স কনফারেন্স এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা মনে করছে, খ্রিস্টানদের শান্তিপূর্ণভাবে বড়দিন উদযাপন করার অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। বিশপ’স কনফারেন্সের বক্তব্য, উগ্রপন্থীদের এই আক্রমণ শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নয়, দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার অধিকারও ক্ষুণ্ণ করছে।

মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বছরে ভারতে খ্রিস্টানদের ওপর অন্তত ৬০০টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। বড়দিনের সময় এই হামলার সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। সংগঠনগুলো মনে করছে, শুধু সামাজিক সচেতনতা বা নিন্দা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়; কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। ভারতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি, তাদের উৎসব ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়া, এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদেরকে হুমকির মুখে ফেলা—সবই একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বিদ্বেষ প্রচারের অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক সংহতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই হামলা ও হেনস্তার ঘটনা তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ভীতির সৃষ্টির পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভারত সরকারের কাছে খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা মনে করছে, ধর্মীয় উৎসব উদযাপনে বাধা দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের সমতুল্য।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বড়দিনের অনুষ্ঠান ও গির্জার চারপাশে পুলিশি নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে, তবে বাস্তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। এর পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশেও ধর্মীয় সহনশীলতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং সামাজিক সংহতির প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ভারতের বড়দিনে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলা শুধুই একদিনের ঘটনা নয়। এটি দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে কেন্দ্র করে একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ, সামাজিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে এমন হামলা রোধ করার প্রয়োজন রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত