ক্ষমতার অপব্যবহারে দোষী সাব্যস্ত নাজিব রাজাক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
ক্ষমতার অপব্যবহারে দোষী সাব্যস্ত নাজিব রাজাক

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ বা ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এসে পৌঁছেছে দেশটি। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। শুক্রবার কুয়ালালামপুর হাইকোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে ওয়ানএমডিবি প্রকল্পের তহবিল থেকে প্রায় ৫৩৯ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে স্থানান্তরের ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহারের চারটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এই রায় শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পরিণতির প্রশ্ন নয়, বরং মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও এক গভীর তাৎপর্য বহন করে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক কলিন লরেন্স সিকেরা বলেন, আদালতের কাছে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে অভিযুক্ত নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিচারকের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং ওয়ানএমডিবির উপদেষ্টা বোর্ডের চেয়ারম্যান—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় নাজিব রাজাক তার ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যক্তিগত স্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন। আদালতের এই মন্তব্য মালয়েশিয়ার ইতিহাসে ক্ষমতাসীন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া অন্যতম কঠোর পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি শুধু মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বৈশ্বিক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের উদাহরণ হিসেবেও পরিচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও বিলাসবহুল সম্পত্তি কেনার মাধ্যমে এই অর্থের ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে এই চারটি অভিযোগ ছাড়াও অর্থ পাচারের আরও ২১টি অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি অভিযোগে তার ১৫ থেকে ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে তার জন্য আরও কঠিন আইনি বাস্তবতা অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন যে, নাজিব রাজাক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থেকে জনগণের আস্থা ভঙ্গ করেছেন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সংগৃহীত অর্থ নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন।

এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত ঘটে ২০১৫ সালে, যখন মালয়েশিয়ায় প্রথম প্রকাশ পায় যে ওয়ানএমডিবি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে বিষয়টি আরও বিস্তৃত আকারে সামনে আসে। তখন থেকেই নাজিব রাজাকের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচনে তার দল ক্ষমতা হারায়, যা অনেকেই ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির সরাসরি ফল বলে মনে করেন।

এর আগে ২০২০ সালে ওয়ানএমডিবি তহবিলের প্রায় ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার অপব্যবহারের দায়ে নাজিব রাজাককে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সাজা কমিয়ে ছয় বছরে নামিয়ে আনা হয়। তবে সর্বশেষ রায়ে নতুন করে তার আইনি সংকট আরও গভীর হলো। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে তহবিল আত্মসাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।

গত বছর নাজিব রাজাক ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির জন্য জনসমক্ষে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই ঘটনায় তিনি অনুতপ্ত। তবে একই সঙ্গে তার দাবি ছিল, পলাতক মালয়েশিয়ান অর্থদাতা ঝো লো তাকে বিপথগামী করেছিলেন। ঝো লোকে এই কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাকে ধরতে ২০১৬ সাল থেকে ইন্টারপোলের সহায়তায় আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান চলছে। নাজিবের এই বক্তব্যকে কেউ কেউ দায় এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখলেও, তার সমর্থকেরা মনে করেন, পুরো ঘটনা ছিল একটি জটিল আন্তর্জাতিক চক্রের ফল।

ওয়ানএমডিবি প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল ২০০৯ সালে, মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়ে। দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। শুরুতে এটি একটি উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রথম যখন ব্যাংক ও বন্ড-মালিকদের মাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয় প্রকল্পটি, তখনই এর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নই ধীরে ধীরে রূপ নেয় ইতিহাসের অন্যতম বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে।

নাজিব রাজাক ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়কালে তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার কথা বললেও, ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আজকের রায় তার সেই উত্তরাধিকারের ওপর এক চূড়ান্ত বিচার বলেই মনে করছেন অনেকে।

এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন, এত বড় কেলেঙ্কারির বিচার শেষ হতে এত সময় লাগা নিজেই একটি প্রশ্ন। তবুও অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, এই রায় মালয়েশিয়ায় ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

সব মিলিয়ে, নাজিব রাজাকের দোষী সাব্যস্ত হওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত আইনি পরিণতি নয়। এটি মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা দেখিয়ে দেয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। একই সঙ্গে এটি বিশ্বব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে একটি শক্ত বার্তা—রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হতেই হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত