প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ৩০০ ফিট সড়ক। গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল জনসমাগম ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজনটি রাজনৈতিকভাবে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তেমনি অনুষ্ঠান শেষে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সমাবেশস্থল থেকে মোট ১৪৮ টন বর্জ্য অপসারণ করে এলাকাটি আবার জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী করে তোলে সংস্থাটি।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতেই নগর প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ সকালে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে ৩০০ ফিট এলাকার বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী শুক্রবার সকাল থেকেই একটি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে ডিএনসিসির মোট ৩৫০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী অংশ নেন, যারা শীত উপেক্ষা করে নিরলসভাবে কাজ করেন।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ব্যবহার করা হয়। ডিএনসিসির তত্ত্বাবধানে ২০টি ট্রাক দিয়ে মোট ১৪৮টি ট্রিপে সংগৃহীত বর্জ্য রাজধানীর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নিরাপদভাবে ডাম্পিং করা হয়। বর্জ্যের মধ্যে ছিল প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট, ব্যানার, পোস্টার, কাগজ, পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা। দুপুরের মধ্যেই পুরো সমাবেশ এলাকা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক যান চলাচল ও পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়।
ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বড় রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসমাগমের পর সাধারণত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। তবে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত জনবল থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব। ৩০০ ফিট এলাকায় পরিচালিত এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে তারা একটি সফল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হন। তারা হাতে হাতে বর্জ্য সংগ্রহ, ব্যাগে ভরা এবং ট্রাকে তুলতে সহযোগিতা করেন। নগর ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক কর্মীদের এমন স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, শীতের সকালে আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বিএনপির যেসব নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় এই কাজে অংশ নিয়েছেন, তাদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে আমরা এই শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারব। তিনি আরও বলেন, একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের মতে, যেকোনো উৎসব, রাজনৈতিক সমাবেশ বা বড় জনসমাগমের পর নগর প্রশাসনের সঙ্গে যদি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হন, তাহলে নগর ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হয়ে যায়। এতে একদিকে যেমন দ্রুত পরিষ্কার করা সম্ভব হয়, অন্যদিকে নাগরিক দায়িত্ববোধও বাড়ে। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলা একটি যৌথ দায়িত্ব, যেখানে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
৩০০ ফিট এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দারাও ডিএনসিসির এই দ্রুত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই বলেন, বড় সমাবেশের পর দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকলে দুর্ভোগ বাড়ে। কিন্তু এবার অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকা পরিষ্কার হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন তারা। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ নিয়মিত হলে বড় আয়োজনের পর জনভোগান্তি অনেক কমে যাবে।
নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক আয়োজন অনিবার্য। তবে এসব আয়োজনের পর পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যদি আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে করা যায়, তাহলে নগরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সহজ হয়। ৩০০ ফিট এলাকার এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্যান্য বড় আয়োজনের ক্ষেত্রেও অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে বলে তারা মত দেন।
পরিবেশবিদদের মতে, বর্জ্য দ্রুত সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট ল্যান্ডফিলে ডাম্পিং করা না হলে তা পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। সে দিক থেকে ডিএনসিসির উদ্যোগ সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচির আয়োজকদেরও ভবিষ্যতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সব মিলিয়ে, ৩০০ ফিট সমাবেশস্থল থেকে ১৪৮ টন বর্জ্য অপসারণের ঘটনা শুধু একটি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সম্মিলিত উদ্যোগের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। ডিএনসিসি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবী রাজনৈতিক কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজধানী আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। এই উদ্যোগ নাগরিকদের মধ্যেও একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—শহর পরিচ্ছন্ন রাখা কেবল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত কর্তব্য।