শাহবাগে অবস্থানের ডাক ইনকিলাব মঞ্চের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯২ বার
শাহবাগে অবস্থানের ডাক ইনকিলাব মঞ্চের

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে দেশের মানুষকে শাহবাগে এসে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছে শহীদ হাদির প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। মিছিলটি ক্যাম্পাস ও আশপাশের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। একই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনকিলাব মঞ্চের নিজস্ব ফেসবুক পেজ থেকে দেশব্যাপী এই আহ্বান জানানো হয়।

শুক্রবারের এই কর্মসূচিকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনা ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সমর্থক। হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে তারা ‘হাদির হত্যার বিচার চাই’, ‘খুনিদের বিচার নিশ্চিত কর’—এমন স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন ক্যাম্পাস এলাকা। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা, পেছনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ইনকিলাব মঞ্চ তাদের ফেসবুক পোস্টে জানায়, “বাংলাদেশের জনগণকে শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে এসে অবস্থান করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এটি ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।” পোস্টে আরও বলা হয়, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এবং প্রয়োজনে কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা হবে।

শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না হলে তারা রাজপথ ছাড়বেন না। ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা অভিযোগ করেন, হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হলেও এখনো তাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

একজন বক্তা বলেন, “হাদি ছিলেন একজন সচেতন নাগরিক, একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী। তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামী দিনে যে কেউ এভাবে নিহত হতে পারে।” তিনি দাবি করেন, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়; এটি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শহীদ শরীফ ওসমান হাদির পরিবার এখনো শোকে মুহ্যমান। তাদের একমাত্র দাবি—খুনিদের বিচার। সংগঠনটি মনে করে, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো এই পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে সহযোগিতা করা। বক্তারা বলেন, বিচার বিলম্বিত হলে ক্ষোভ আরও বাড়বে এবং তা সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার অবস্থার অবনতি হলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের উদ্যোগে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে টানা কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রাথমিক তদন্তে হাদিকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তি ঘটনার পরপরই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে দেশ ছাড়ার সুযোগ পেলেন।

শরীফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তিনি একজন সক্রিয় ও প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ বিভিন্ন সময়ে নাগরিক অধিকার, নির্বাচন, বিচার ও সংস্কার ইস্যুতে রাজপথে সরব ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তার হত্যাকাণ্ডকে অনেকেই রাজনৈতিক সহিংসতার অংশ হিসেবে দেখছেন।

শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষদের অনেকেই আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তারা হাদিকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তার মৃত্যু তাদের নাড়া দিয়েছে। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “এটা শুধু হাদির ব্যাপার নয়। এটা আমাদের সবার নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিচার না হলে আমরা কেউই নিরাপদ নই।” আরেকজন বলেন, “শাহবাগে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু প্রতিবাদ করছি না, আমরা আমাদের বিবেকের দায় পালন করছি।”

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখতে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তবে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই চলে।

ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা জানান, শাহবাগের এই অবস্থান কর্মসূচি প্রাথমিকভাবে প্রতীকী হলেও প্রয়োজনে এটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। তারা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, ন্যায়বিচারের দাবিতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। তাদের ভাষায়, “আজ হাদি, কাল অন্য কেউ—এই চক্র ভাঙতে হলে বিচার নিশ্চিত করতেই হবে।”

সব মিলিয়ে, শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ঘিরে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। এই আন্দোলন কতদূর গড়ায় এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কী ধরনের অগ্রগতি আসে, সেদিকেই এখন নজর দেশবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত