ধ্বংসস্তূপের মাঝেই স্নাতক ১৭০ গাজাবাসী চিকিৎসক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৯ বার
ধ্বংসস্তূপের মাঝেই স্নাতক ১৭০ গাজাবাসী চিকিৎসক

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার ইতিহাসে এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব। অবিরাম বোমাবর্ষণ, ধ্বংসস্তূপ, অনাহার ও বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেও ১৭০ জন তরুণ-তরুণী চিকিৎসক তাঁদের স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বৃহস্পতিবার গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সামনে আয়োজিত হয় এই ব্যতিক্রমধর্মী স্নাতক সমাপণী অনুষ্ঠান। একসময় যে হাসপাতাল ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র, সেই হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষই হয়ে ওঠে আশার প্রতীক ও অদম্য মানবিক দৃঢ়তার মঞ্চ।

আল-শিফা হাসপাতাল গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ইসরাইলি হামলায় হাসপাতালটির অধিকাংশ ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, জরুরি বিভাগ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম হয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, নয়তো অকেজো হয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই দাঁড়িয়ে স্নাতক টুপি পরা তরুণ চিকিৎসকদের দৃশ্য যেন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার বিপরীতে মানবতার শক্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

এই ১৭০ জন চিকিৎসক এমন এক সময়ে তাঁদের পড়াশোনা শেষ করেছেন, যখন গাজা কার্যত অবরুদ্ধ এক জনপদ। গত দুই বছরে তারা প্রত্যক্ষ করেছেন অনাহার, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট, প্রতিদিনের বোমা হামলা, পরিবার হারানোর বেদনা এবং অবিরাম বাস্তুচ্যুতি। তবুও এসব তরুণ চিকিৎসক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আহতদের সেবা দিয়েছেন, রাতের পর রাত অস্ত্রোপচার করেছেন, রক্তাক্ত শিশুদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছেন এবং সেই সঙ্গে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত ওয়ার্ডে, কখনো আশ্রয়শিবিরের অন্ধকার কোণে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ইউসুফ আবু আল-রেইশ এই স্নাতক অর্জনকে বর্ণনা করেন এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায়। তিনি বলেন, এটি কোনো সাধারণ স্নাতক সমাপণ নয়; এটি ‘বোমাবর্ষণ, ধ্বংসস্তূপ এবং রক্তনদীর মধ্য দিয়ে’ অর্জিত এক বিজয়। তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্ব, কিন্তু চোখে ফুটে উঠছিল দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি ও শোক।

স্নাতক অনুষ্ঠানের পরিবেশ ছিল একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার মিশেল। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সামনে সারি সারি চেয়ারে বসেছিলেন নবীন চিকিৎসকরা। তাঁদের পাশে রাখা হয়েছিল বেশ কিছু খালি চেয়ার। এই খালি চেয়ারগুলো কোনো শূন্যতা নয়, বরং প্রতীক। এসব চেয়ারে টাঙানো ছিল যুদ্ধের সময় নিহত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ছবি। চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিক—যাঁরা মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের স্মরণেই রাখা হয়েছিল এই খালি আসন। উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

স্নাতকদের একজন ডা. আহমেদ বাসিল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ভেতরে, সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে উন্নত ডিগ্রি অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি একটি বার্তা। তাঁর ভাষায়, এই অর্জন বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে ফিলিস্তিনিরা জীবনকে ভালোবাসে, তারা জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ধ্বংসের মাঝেও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চায়।

এই ১৭০ জনের মধ্যে অনেকেই শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন। কেউ কেউ পড়াশোনার সময় গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্য হারানোর পরও হাসপাতালের কাজে ফিরে এসেছেন। কেউ দিন কাটিয়েছেন ধ্বংসস্তূপের নিচে বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। তবুও তাঁদের কেউই পড়াশোনা থেকে সরে যাননি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ যেন তাঁদের কাছে শুধু পেশা নয়, বরং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক শপথ।

গাজার স্বাস্থ্যখাত বর্তমানে চরম সংকটে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই, এমনকি নিরাপদ পরিবেশও নেই। এর মধ্যেই এই তরুণ চিকিৎসকরা নিজেদের প্রস্তুত করেছেন ভবিষ্যতের জন্য। তাঁদের অনেকেই জানেন না, সামনে কী অপেক্ষা করছে। কর্মস্থল থাকবে কিনা, হাসপাতাল থাকবে কিনা—তা অনিশ্চিত। তবুও তাঁদের চোখে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এই স্নাতকরা শুধু চিকিৎসক নন, তারা গাজার প্রতিরোধের নীরব সৈনিক। অস্ত্র হাতে নয়, তারা লড়ছেন স্টেথোস্কোপ, জ্ঞান ও মানবিকতার শক্তি দিয়ে। প্রতিটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা তাদের কাছে একেকটি বিজয়।

বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই স্নাতক অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এটি আধুনিক ইতিহাসে শিক্ষার প্রতি মানুষের অটল বিশ্বাসের এক বিরল উদাহরণ। যুদ্ধ যেখানে মানুষকে ভেঙে দেয়, সেখানে এই তরুণ চিকিৎসকরা দেখিয়ে দিয়েছেন—জ্ঞান ও মানবিকতা ধ্বংসস্তূপের মাঝেও অঙ্কুরিত হতে পারে।

গাজাবাসীর কাছে আল-শিফা হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; এটি ছিল আশা, নিরাপত্তা ও জীবনের প্রতীক। আজ সেই হাসপাতালের ধ্বংসপ্রাপ্ত চত্বরে স্নাতক টুপি পরা তরুণদের দাঁড়িয়ে থাকা যেন ভবিষ্যতের প্রতি এক নিঃশব্দ ঘোষণা। তারা জানিয়ে দিচ্ছে, যত বড় ধ্বংসই আসুক, শিক্ষা ও মানবিকতা থেমে থাকবে না।

এই ১৭০ জন চিকিৎসকের স্নাতক অর্জন গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। এটি শুধু ফিলিস্তিনের গল্প নয়, এটি গোটা মানবজাতির জন্য এক শক্ত বার্তা—যুদ্ধের মধ্যেও মানুষ জীবন বেছে নেয়, আশা বেছে নেয় এবং আগামীর জন্য লড়াই চালিয়ে যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত