প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শনিবার বিকেলে রূপ নেয় প্রতিবাদী কণ্ঠের এক আবেগঘন মঞ্চে। বিপ্লবী জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবিতে সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ও সিলেট ইনকিলাব মঞ্চের শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মীরা। বিকেল তিনটা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় একটাই দাবি—খুনিদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
‘উই আর হাদি, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘খুনিদের বিচার চাই’—এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। হাতে প্ল্যাকার্ড, চোখেমুখে ক্ষোভ ও বেদনার ছাপ নিয়ে উপস্থিত জনতা বারবার স্মরণ করেন শহীদ ওসমান হাদির সংগ্রামী জীবন ও আদর্শকে। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি জীবনহানি নয়, এটি ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর সরাসরি আঘাত।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন শাবিপ্রবি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদি তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা যায় না। আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি তাঁর রক্তের দায় রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিতে। তিনি অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের এতদিন পরও প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত না করা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
সদস্য সচিব হীরা আক্তার তাঁর বক্তব্যে বলেন, হাদির হত্যার বিচার শুধু একটি সংগঠনের দাবি নয়, এটি দেশের সচেতন মানুষের নৈতিক দাবি। তিনি বলেন, যদি এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতা ও দমননীতিকে উৎসাহিত করবে। তাঁর ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সত্যিই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে।
যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব হাসান অনু ও রাকিবুল হাসান তাঁদের বক্তব্যে বলেন, শহীদ হাদির আদর্শ ছিল শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। তাঁরা বলেন, বিচার বিলম্বিত হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয় এবং রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন শাবিপ্রবি ইনকিলাব মঞ্চের আরও নেতারা, যাঁদের মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক নুর নবী হাসান, আরাফাত হোসেন, নয়ন মিয়া ও লোকমান মিয়া উল্লেখযোগ্য। যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ হোসাইন, আবরার বিন সেলিম, রুবেল মিয়া, হাসানুজ্জামান রাফি, আশিক রহমান ও তাওহীদুল ইসলামও অবস্থান কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দপ্তর সম্পাদক শুয়াইব আহমেদ চৌধুরী, মিডিয়া সম্পাদক রাফসান আহমেদ নাসিম, পাঠচক্র-বিষয়ক সম্পাদক আবু নাঈম চৌধুরী, পরিবেশ ও পর্যটন সম্পাদক আবিদ খান মৌ এবং ক্রীড়া ও ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক জুবায়ের রায়হান কর্মসূচির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অংশ নেন।
অবস্থানকালে ইনকিলাব মঞ্চের সিলেট জেলার নেতাকর্মীরাও সংহতি প্রকাশ করেন। আলতাফুর রহমান তাসনিম, মোস্তাফিজুর রহমান রায়হান, আদিব খান, মো. আবু ওবাইদা সিদ্দিকী, মো. শাহরিয়ার রশিদ, সাজেদুল কবির শাওন, তাজুল ইসলাম রুপক, আবরার আদিব, নিয়ামুল ইসলাম নিরব, ইশমামুল আমান, মোফাজ্জল আহমেদ শাকিল, মো. রবিউল, শাহরিয়ার নাফিজ, সাইয়েদ মানজির-ই-তাসনিম, আব্দুস শহিদ মুজাহিদ, তাসনিম আল মামুন, মারুফ হাসান তানিম ও এহতেশামুর রহমানসহ অনেকেই এতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক রূপ দেয়।
বক্তারা বলেন, শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাঁরা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী মহলের চাপ ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতির হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা ভেঙে পড়বে। বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, হাদি আমাদের ভাই, আমাদের সহযোদ্ধা। তাঁর হত্যার বিচার না হলে আমরা কেউই নিরাপদ নই। আরেকজন বলেন, আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়েছি শুধু শোক প্রকাশ করতে নয়, বরং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে।
কর্মসূচির শেষাংশে শহীদ ওসমান হাদির আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। নেতাকর্মীরা ঘোষণা দেন, বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে এবং প্রয়োজনে আরও বৃহত্তর কর্মসূচির দিকে যাবেন। তাঁরা বলেন, হাদির রক্তের ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত ইনকিলাব মঞ্চ ও সচেতন শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়বে না।
উল্লেখ্য, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখ। তাঁর সাহসী ভূমিকা ও স্পষ্ট অবস্থানের কারণে তিনি বহু তরুণের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সিলেটের এই অবস্থান কর্মসূচি সেই ধারাবাহিক আন্দোলনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।