প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার সকালে রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে তিনি একে একে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। শ্রদ্ধা ও নীরবতার আবহে এই জিয়ারত পরিণত হয় এক আবেগঘন মুহূর্তে, যেখানে অতীতের এক শোকাবহ অধ্যায় নতুন করে স্মরণে আসে।
জিয়ারতকালে তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. একেএম শামছুল ইসলাম। কবরস্থানে প্রবেশের পর কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি শহীদদের স্মরণ করেন। পরে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। উপস্থিত ব্যক্তিদের চোখেমুখে ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার ছাপ। পিলখানা ট্র্যাজেডির ভয়াবহ স্মৃতি আজও যে জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে আছে, সেই বাস্তবতা যেন এ সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ বহু মেধাবী ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু সশস্ত্র বাহিনী নয়, পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, শৃঙ্খলা ও আস্থার ওপর যে আঘাত এসেছিল, তার রেশ আজও কাটেনি।
তারেক রহমানের এই কবর জিয়ারতকে অনেকেই দেখছেন শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে। বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, পিলখানা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সেই দায়বদ্ধতারই একটি অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কবর জিয়ারতের সময় তারেক রহমান কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না দিলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, পিলখানার শহীদরা জাতির গর্ব। তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, যা কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। তাঁদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। এই শ্রদ্ধা নিবেদন সেই অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ।
উল্লেখ্য, পিলখানা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর সংকট তৈরি করেছিল। বিদ্রোহ দমনের পর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও আজও এই ঘটনার নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন, আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে, এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটন এবং সকল দায়ী ব্যক্তির যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা গেলে তবেই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব হবে।
পিলখানার শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারতের আগে তারেক রহমান বনানী সামরিক কবরস্থানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কাছের মানুষদের কবরও জিয়ারত করেন। তিনি তাঁর প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো এবং শ্বশুর মাহবুব আলী খানের কবর জিয়ারত করে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পরিবারের সদস্যদের স্মরণে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ব্যক্তিগত শোক ও জাতীয় শোক যেন এই সফরে একসূত্রে মিলিত হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বিভিন্ন কর্মসূচি ও উপস্থিতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এর মধ্যে পিলখানার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাঁর রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থানকে নতুনভাবে সামনে এনেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এই বার্তা রাজনৈতিক সৌজন্যের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বনানী সামরিক কবরস্থান এমনিতেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শেষ ঠিকানা হিসেবে পরিচিত। এখানে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্ব পালনকালে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবর রয়েছে। শনিবার সকালে সেখানে তারেক রহমানের উপস্থিতি কবরস্থানের পরিবেশকে আরও গম্ভীর ও আবেগঘন করে তোলে। সাধারণ মানুষের অনেকেই দূর থেকে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এবং শহীদদের জন্য দোয়া করেন।
পিলখানা ট্র্যাজেডির প্রায় দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনা আজও জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর বেদনা, তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়ে এই অধ্যায় এখনো অসমাপ্ত বলেই মনে করেন অনেকে। তারেক রহমানের এই কবর জিয়ারত সেই অসমাপ্ততার কথাই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।