সিলেটে ১০৩ রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে জেলা প্রশাসনের সম্মাননা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৩ বার
সিলেটে ১০৩ রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে জেলা প্রশাসনের সম্মাননা

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান অনস্বীকার্য। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও সামাজিক অগ্রগতিতে তাঁদের ভূমিকা অনন্য। সেই অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি জানাতে সিলেটে ১০৩ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে সম্মাননা প্রদান করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে সিলেট নগরের রিকাবীবাজারে কবি নজরুল অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক ও আবেগঘন অনুষ্ঠানে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশ্বের ১১টি দেশের প্রবাসী সিলেট জেলার ১০৩ জন বাংলাদেশিকে সম্মানিত করা হয়। তাঁরা সফল পেশাজীবী, সফল ব্যবসায়ী, সফল কমিউনিটি নেতা, সফল নারী উদ্যোক্তা, খেলাধুলায় সাফল্য অর্জনকারী এবং বাংলাদেশি পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশে আমদানিকারক—এই ছয়টি ক্যাটাগরিতে নিজেদের অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে জেলা প্রশাসনের এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল নাসের খান।

সম্মাননা অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এই র‌্যালিতে প্রবাসী বাংলাদেশি, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। র‌্যালিটি নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কবি নজরুল অডিটরিয়ামে এসে শেষ হয়। র‌্যালির মাধ্যমে প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আব্দুল নাসের খান বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের নীরব নায়ক। দূরদেশে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, তা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় না, বরং দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে। তিনি বলেন, সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এই সম্মাননা সেই স্বীকৃতিরই একটি প্রতীক।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন নবী তাঁর বক্তব্যে বলেন, সিলেট অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবে প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার মানুষের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, এই সম্মাননা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়, বরং প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, প্রবাসীরা দেশের ভাবমূর্তি বিদেশে উজ্জ্বল করছেন। তাঁদের সততা, শ্রম ও সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করছে। তিনি বলেন, প্রবাসীরা যেন নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে দেশে আসা-যাওয়া করতে পারেন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রবাসী অর্জনের গল্প জানানো। তিনি জানান, গত ২০ দিনে সম্মাননার জন্য মোট ৫৮২টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই ও বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১০৩ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।

পুলিশ সুপার কাজী আখতারুল আলম বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নেও অবদান রাখছেন। অনেক প্রবাসী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক খাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন, যা সমাজকে এগিয়ে নিচ্ছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা বলেন, এই সম্মাননা আয়োজনের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশের মানুষের মধ্যে একটি দৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।

সম্মাননা প্রাপ্ত প্রবাসীদের অনেকেই তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একজন সম্মাননা প্রাপ্ত প্রবাসী ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে কাজ করেছি শুধু পরিবারের জন্য নয়, দেশের জন্যও। আজ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পেয়ে মনে হচ্ছে আমাদের শ্রম সার্থক হয়েছে। একজন নারী উদ্যোক্তা বলেন, প্রবাসে নারী হিসেবে কাজ করা সহজ ছিল না, কিন্তু এই সম্মাননা আমাকে আরও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রেমিট্যান্স যোদ্ধারা শুধু অর্থ পাঠান না, তাঁরা প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরিচয় তুলে ধরেন। তাঁদের সাফল্য প্রবাসী তরুণদের নতুন পথ দেখায়। এ ধরনের সম্মাননা আয়োজন নিয়মিত হলে প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে মত দেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সম্মাননা প্রাপ্তদের মুখে হাসি, গর্ব ও তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। তাঁদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সংগ্রাম ও অর্জনের গল্প।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জন করে, যার বড় একটি অংশ আসে সিলেট অঞ্চল থেকে। এই রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসীদের এমন স্বীকৃতি প্রদান করলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ বাড়বে এবং প্রবাসীদের মধ্যে দেশের প্রতি ইতিবাচক অনুভূতি আরও গভীর হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত