প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিশোরগঞ্জে বিএনপির একটি মশাল মিছিল চলাকালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মিজানুর রহমান (৬০) নামে দলের এক নেতার মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে কিশোরগঞ্জ–১ (সদর–হোসেনপুর) আসনে বিএনপির দেওয়া মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে আয়োজিত এই মশাল মিছিলকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটে। রাজনৈতিক কর্মসূচির উত্তাপ, শারীরিক অসুস্থতা এবং আকস্মিক এই মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর শোক ও ক্ষোভ, একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নিহত মিজানুর রহমান কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের প্যারাভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ওই এলাকার সন্দু বেপারীর ছেলে এবং মারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা স্থানীয় পর্যায়ে একজন পরিচিত ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ–১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ ও বিরোধের প্রেক্ষাপটে শুক্রবার রাতে মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। মনোনয়ন প্রত্যাশী মাসুদ হিলালী, রেজাউল করিম খান চুন্নু, রুহুল হোসাইন, অ্যাডভোকেট শরীফুল ইসলাম শরীফ এবং ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, শুক্রবার রাতে পুরাতন স্টেডিয়ামের সামনে থেকে মশাল মিছিলটি শুরু হওয়ার কথা ছিল। মিছিল শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ করে মিজানুর রহমান অসুস্থবোধ করেন। তিনি শারীরিক দুর্বলতা ও বুকে ব্যথার কথা জানান। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আশপাশে থাকা নেতাকর্মীরা দ্রুত তাঁকে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মিছিলটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করা হয় এবং এলাকায় শোকের আবহ ছড়িয়ে পড়ে। নেতাকর্মীরা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভিড় জমান এবং মিজানুর রহমানের মরদেহ একনজর দেখতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল বলেন, “মিজানুর রহমান আমাদের দলের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। দলের যেকোনো কর্মসূচিতে তিনি সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করতেন। আজকের এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো দলকে ব্যথিত করেছে।” তিনি আরও বলেন, মনোনয়ন ইস্যুতে আন্দোলন চললেও এমন মর্মান্তিক ঘটনা কেউ কল্পনাও করেনি।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি কখনোই সহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। দলীয় কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করলেও তাঁর আচরণ ছিল শান্ত ও সংগঠকসুলভ। এলাকাবাসীর কাছেও তিনি একজন পরিচিত মুখ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে স্থানীয় রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
ঘটনার পরপরই মিজানুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছান। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আগে থেকে হৃদরোগে ভুগছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বয়সজনিত কারণে তিনি মাঝেমধ্যে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেন বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক কর্মসূচির চাপ ও মানসিক উত্তেজনা অনেক সময় নেতাকর্মীদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বয়সী নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এমন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। মিজানুর রহমানের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
এদিকে, মিজানুর রহমানের মৃত্যুতে জেলা ও উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন ইউনিট থেকে শোকবার্তা জানানো হয়েছে। দলীয় নেতারা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। পাশাপাশি, তাঁর অবদান স্মরণ করে দলীয় পর্যায়ে শোকসভা ও দোয়া মাহফিল আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে।
কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মৃত্যুর প্রভাব পড়েছে। অনেকেই বলছেন, মনোনয়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আন্দোলনের মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সাধারণ মানুষও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি যেন প্রাণঘাতী চাপের কারণ না হয়, সে বিষয়ে দলগুলোর আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি একটি স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্তের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবারই নেবে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জ–১ আসনকে ঘিরে বিএনপির মনোনয়ন প্রশ্নে সাম্প্রতিক সময়ে দলের ভেতরে আলোচনা ও উত্তেজনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবারের মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। তবে এই আন্দোলনের মধ্যেই এক নেতার প্রাণহানি পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি নেতাকর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনা তা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল।