প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেলসহ এক বহিষ্কৃত সাবেক শিবির নেতাকে আটকের ঘটনা স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। শনিবার উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ভারত সীমান্তসংলগ্ন আউলিয়ার হাট এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় তাকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আটক ব্যক্তির নাম মো. আতিক হাসান (২৫)। তিনি পাটগ্রাম উপজেলার শিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরের দিকে ৬১ বিজিবির তিস্তা ব্যাটালিয়নের একটি টহল দল সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছিল। এ সময় সন্দেহজনকভাবে সীমান্তের দিকে যাতায়াত করতে থাকা একটি মোটরসাইকেল নজরে আসে। টহল দলটি মোটরসাইকেলটিকে থামার সংকেত দিলে চালক পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া দিয়ে তাকে আটক করা হয়। তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে একটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়।
আটক মো. আতিক হাসান পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চান্দের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তিনি বজলার রহমানের ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পাটগ্রাম উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২২ সালে দলের প্রতি নিষ্ক্রিয়তা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
৬১ বিজিবির তিস্তা ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে বিজিবির নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে এই আটক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অভিযানে একজনকে দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেলসহ আটক করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা মালামালসহ তাকে পাটগ্রাম থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র বহন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিজিবি সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “বিজিবি দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেলসহ একজনকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। চোরাচালান ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় একটি এজাহার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি সীমান্ত এলাকায় সন্দেহজনক চলাচলের কথা স্বীকার করেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে, পাটগ্রাম উপজেলা শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি খোরশেদ আলম সংবাদমাধ্যমকে জানান, আটক আতিক হাসান বর্তমানে সংগঠনের কোনো দায়িত্বে নেই। তিনি বলেন, “২০২২ সালে দলের প্রতি মনোযোগী না থাকা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়তার কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তার সঙ্গে সংগঠনের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।” তিনি আরও বলেন, সংগঠন কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বা আইনবহির্ভূত আচরণ সমর্থন করে না।
স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে এই ঘটনায় নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় পাটগ্রামে চোরাচালান একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভারত সীমান্তঘেঁষা শ্রীরামপুর ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন সময় গবাদিপশু, মাদক, মোবাইল ফোনসহ নানা পণ্যের চোরাচালানের অভিযোগ উঠে আসে। স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারি জোরদার হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে চোরাচালান কিছুটা কমলেও মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা সামনে আসছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আটক ব্যক্তির পরিচয় আগে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি কীভাবে ও কেন সীমান্ত এলাকায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চলাচল করছিলেন, তা উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই এ ধরনের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চোরাচালানকারীরা অনেক সময় নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য দেশীয় অস্ত্র বহন করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকুক বা না থাকুক, অপরাধে জড়িত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
এদিকে, বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে চোরাচালানের প্রবণতা বাড়ে বলে বিজিবি বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। সীমান্তবর্তী জনগণকে যেকোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দেখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে দেখার চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এটি একটি নিয়মিত চোরাচালানবিরোধী অভিযানের অংশ এবং আইনের চোখে সবাই সমান। সংগঠনের বর্তমান বা সাবেক পরিচয় নয়, বরং অপরাধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।