এনসিপি ছাড়লেন মওলানা ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
এনসিপি ছাড়লেন মওলানা ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারী এবং মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী। রোববার রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ আবেগঘন ঘোষণার মাধ্যমে তিনি এনসিপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কচ্ছেদের কথা জানান। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট হওয়ার খবর সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিলে, তার পরপরই দলটির একাধিক নেতা-কর্মীর পদত্যাগের ধারাবাহিকতায় আজাদ খান ভাসানীর এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আজাদ খান ভাসানী তাঁর ঘোষণায় জানান, অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে তরুণ নেতৃত্ব সামনে আসে, তাদের হাত ধরেই নতুন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও গণমানুষনির্ভর রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্নে তিনি এনসিপির সঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, তিনি শুরু থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লড়াইয়ের একটি ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবে আত্মস্থ করেছিলেন। তেপ্পান্ন বছরের পুঞ্জীভূত বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত রাখাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রার মূল প্রেরণা।

পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর দেখানো গণমানুষনির্ভর, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার রাজনীতির আদর্শ থেকেই তিনি প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই তিনি দলের কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কৃষকসমাজের অধিকার, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর রাজনীতির মূল স্রোতে আনার লক্ষ্যেই তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর হতাশার কথাও অকপটে তুলে ধরেছেন আজাদ খান ভাসানী। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, গণমানুষের প্রতি যে গভীর দরদ ও ত্যাগের প্রয়োজন, বাস্তবে তার সুস্পষ্ট ঘাটতি তিনি অনুভব করেছেন। তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এনসিপি প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বেশ কিছুদিন ধরে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে না থাকলেও দলটির সঠিক রাজনীতি ও সাফল্য কামনা করে গেছেন।

আজাদ খান ভাসানীর পদত্যাগের ঘোষণায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, তিনি এটিকে কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং মওলানা ভাসানীর আদর্শের পক্ষাবলম্বনই তাঁর কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতেই তিনি এনসিপির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আজাদ খান ভাসানীর এই পদত্যাগ এনসিপির জন্য শুধু সাংগঠনিক ক্ষতিই নয়, বরং আদর্শিক প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। মওলানা ভাসানীর নাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর নাতি হিসেবে আজাদ খান ভাসানীর এনসিপিতে যুক্ত হওয়া দলটির জন্য একটি নৈতিক ও আদর্শিক শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর সরে দাঁড়ানো দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের সম্ভাব্য জোটের খবর প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শের সঙ্গে এ ধরনের জোট কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্ন তুলে অনেক নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে তাদের অসন্তোষ জানান। আজাদ খান ভাসানীর ঘোষণায় সরাসরি জামায়াতের নাম উল্লেখ না থাকলেও, তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট থেকে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গভীর অস্বস্তির ইঙ্গিত স্পষ্ট।

পদত্যাগ ঘোষণার শেষ অংশে আজাদ খান ভাসানী ব্যক্তিগতভাবে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তরুণদের এই রাজনৈতিক দলের প্রতি আন্তরিক শুভকামনা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গণমানুষের রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রামে এনসিপি যেন সঠিক পথ খুঁজে পায়। এই বক্তব্যে একদিকে যেমন তাঁর মানবিক ও ভদ্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় ফুটে উঠেছে, তেমনি দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অন্তর্নিহিত উদ্বেগও প্রতিফলিত হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, আজাদ খান ভাসানীর পদত্যাগ বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি কেবল একটি দলের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সংবাদ নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। রাজনীতির মাঠে এই সিদ্ধান্ত কী ধরনের প্রভাব ফেলবে এবং এনসিপি এর জবাবে কী অবস্থান নেয়, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, মওলানা ভাসানীর আদর্শের উত্তরাধিকার বহনকারী একজন রাজনৈতিক কর্মীর এই সরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত