প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির ভেতরে চলমান টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেত্রী অ্যাডভোকেট মনজিলা সুলতানা ঝুমা। রোববার রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক ঘোষণায় তিনি স্পষ্ট করে জানান, মনোনয়ন পেলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে এনসিপির সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ফেসবুক পোস্টে মনজিলা ঝুমা জানান, এনসিপি প্রাথমিকভাবে যেসব ১২৫টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল, তার মধ্যে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নম্বর আসনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে তাঁকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। ২৪ ডিসেম্বর তাঁর পক্ষে দলের খাগড়াছড়ি জেলা আহ্বায়ক আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন উত্তোলনও করেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়ের ঠিক আগমুহূর্তে তিনি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের সিদ্ধান্তের কথা তিনি দলীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকেও ব্যক্তিগতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন।
মনজিলা ঝুমার এই ঘোষণায় কোনো তীব্র ভাষা বা অভিযোগের সুর না থাকলেও সিদ্ধান্তের তাৎপর্য রাজনৈতিকভাবে বেশ গভীর। তিনি সরাসরি কেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিলেও সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট এবং এনসিপির অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই তাঁর সিদ্ধান্তের পটভূমি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার পদত্যাগ ও ভিন্ন পথে হাঁটার ঘোষণার পর মনজিলা ঝুমার এই অবস্থান এনসিপির নির্বাচনী কৌশল ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এর আগে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। গত শনিবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পোস্টে এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি ঢাকা–৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানান। তাঁর এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। একই ধারাবাহিকতায় দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনও পদত্যাগ করেন। একের পর এক এমন সিদ্ধান্ত এনসিপিকে একটি অস্থির ও সংকটাপন্ন রাজনৈতিক দল হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
মনজিলা ঝুমার ফেসবুক পোস্টের ভাষা ছিল সংযত ও আশাবাদী। নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি লেখেন, ‘আমি বিশ্বাস করি তরুণরা সংসদে যাবে, আজ নয়তো কাল।’ এই বক্তব্যে একদিকে যেমন তরুণ নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণদের জন্য সংসদের দরজা এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি—এমন একটি আক্ষেপও পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মনজিলা ঝুমার সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এনসিপি মূলত তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। নতুন রাজনীতি, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা বলে দলটি অল্প সময়েই আলোচনায় আসে। কিন্তু নির্বাচনের মুখে এসে দলটির ভেতরে যে ভাঙন ও মতপার্থক্য প্রকাশ পাচ্ছে, তা তরুণ রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
খাগড়াছড়ি অঞ্চলে মনজিলা ঝুমা একজন পরিচিত মুখ। একজন আইনজীবী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন নারী ও তরুণ নেত্রী হিসেবে তাঁর নির্বাচনকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে তাঁর সরে দাঁড়ানো স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও হতাশা তৈরি করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে একই সঙ্গে অনেকে মনে করছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তিনি হয়তো সময় নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এনসিপির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মনজিলা ঝুমার সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। তবে দলটির ভেতরে থাকা একাধিক সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে এমন সিদ্ধান্ত দলীয় সংগঠনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা, মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা এবং কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধাক্কা। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল আসনে প্রার্থী পরিবর্তন বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো দলটির কৌশলকে দুর্বল করে দিতে পারে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মনজিলা ঝুমার পোস্টে কোনো ক্ষোভ বা বিরূপতা নেই। বরং তিনি শান্তভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই ভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল, যেখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ভাষা ও অভিযোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ কারণেই অনেকেই তাঁর সিদ্ধান্তকে ‘পরিণত রাজনৈতিক আচরণ’ হিসেবে দেখছেন।
সামগ্রিকভাবে, নির্বাচন থেকে মনজিলা সুলতানা ঝুমার সরে দাঁড়ানো এনসিপির জন্য শুধু একটি প্রার্থী হারানোর ঘটনা নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন দল ও নতুন মুখের পথচলা এখনো কতটা চ্যালেঞ্জিং। মনজিলা ঝুমা সংসদে না গেলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসা বিশ্বাস—তরুণরা একদিন সংসদে যাবে—এই আশাই হয়তো আগামী দিনের রাজনীতিতে নতুন আলো জ্বালাবে।