হাদি হত্যার বিচার না হলে হুমকিতে জুলাইয়ের নেতৃত্ব: মঞ্চ-২৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার
হাদি হত্যার বিচার না হলে হুমকিতে জুলাইয়ের নেতৃত্ব: মঞ্চ-২৪

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যানটিনে সোমবার সকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলেছে ‘মঞ্চ-২৪’ নামে একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম। তারা বলেছে, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকারের নমনীয়তা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র আজ আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আগামী ২৫ দিনের মধ্যে এই হত্যার বিচার সম্পন্ন না হলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। একই সঙ্গে শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা জানায়, বিচার আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চ-২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে পথে হাঁটছে, তা আবু সাঈদ, ওয়াসিম ও মুগ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর ভাষায়, এই সরকার এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে যেখানে জনগণের ন্যায়বিচারের দাবি নয়, বরং শক্তির আধিপত্য ও আগ্রাসনের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি বলেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাহক। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার কেবল একটি সংগঠন নয়; এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

ফাহিম ফারুকীর বক্তব্যে উঠে আসে হাদির বহুমাত্রিক ভূমিকার কথা। তিনি বলেন, হাদি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর কবিতা, গান, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও রাজনৈতিক ভাষ্য তরুণদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এই ধারাবাহিক আন্দোলন যদি আরও দীর্ঘমেয়াদি হতো, তবে বাংলাদেশে আধিপত্যবাদ কখনোই শক্ত ঘাঁটি গড়তে পারত না—এমনটাই দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধই ছিল আঞ্চলিক শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়। ফাহিম ফারুকী বলেন, হাদি হত্যার মূল অভিযুক্ত ও সহযোগী চক্রকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হওয়া রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয়, বরং একটি বিপজ্জনক বার্তা। এতে অপরাধী গোষ্ঠী মনে করছে, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতাদের হত্যা করলেও রাষ্ট্র নীরব থাকবে। এর ফলশ্রুতিতে জুলাই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ আজ সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মঞ্চ-২৪-এর নেতারা বলেন, শহীদ হাদি হত্যার বিচার কেবল একটি ব্যক্তিগত মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার পরীক্ষাও। তাঁদের দাবি, বিচার বিলম্বিত হলে জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হবে। এই প্রেক্ষাপটে তারা সরকারের কাছে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা গোয়েন্দা সংস্থার কাঠামোগত সংস্কারের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। তাঁদের মতে, নির্বাচনের আগে এই সংস্কার জরুরি, কারণ বর্তমান কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে বিদেশি প্রভাব ও গুপ্ততৎপরতা সক্রিয় রয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা গোয়েন্দা সংস্থার পুনর্গঠন ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

গণমাধ্যম নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন মঞ্চ-২৪-এর নেতারা। তারা বলেন, কিছু গণমাধ্যম গোপনে দেশবিরোধী ও বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে, যা জনমতকে বিভ্রান্ত করছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করার পাশাপাশি পরিকল্পিত অপপ্রচার ও ভ্রান্ত তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায়, গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গেও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট পুনর্মূল্যায়ন সময়ের দাবি। তারা দাবি করেন, প্রতিবেশী দেশ যদি তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া খুনিদের ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো পথ থাকবে না। এই বক্তব্যে আঞ্চলিক রাজনীতির জটিলতা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে আসে।

শাহবাগে চলমান আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে মঞ্চ-২৪ জানায়, ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও দৃঢ়। আন্দোলনকারীরা বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। মানবিক আবেগে ভর করে বক্তারা বলেন, শহীদ হাদি কেবল একটি নাম নয়; তিনি একটি প্রজন্মের আশা ও স্বপ্নের প্রতীক। তাঁর রক্তের ঋণ শোধ না হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংবাদ সম্মেলন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জনআস্থা পুনর্গঠন করতে হলে সরকারকে দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর হবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। মঞ্চ-২৪-এর বক্তব্যে যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রতিফলিত হয়েছে, তা উপেক্ষা করা হলে রাজনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

সব মিলিয়ে, শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচার এখন শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির নৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আগামী ২৫ দিন এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কোন পথে হাঁটে—ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পথে, নাকি নীরবতা ও বিলম্বের পথে—সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক গতিপথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত