প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিছু তথ্যকে সরাসরি ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) নাকি ওসমান হাদির হত্যাকারীদের সহায়তার অভিযোগে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে—এমন দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব বলে জানিয়েছে রাজ্য পুলিশ।
সোমবার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তাদের সরকারি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট তাদের নজরে এসেছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে প্রতিবেশী একটি দেশের একটি সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ কয়েকজন নাগরিককে আটক করেছে। বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, “এই সংবাদ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” যদিও পোস্টে সরাসরি ওসমান হাদি বা বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে প্রেক্ষাপট ও সময় বিবেচনায় এটি যে চলমান গুজবের প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া—তা স্পষ্ট বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এর আগে সোমবার ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় যে ওসমান হাদির হত্যাকারীদের পালাতে ও আত্মগোপনে সহায়তা করার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। এসব পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
এই গুজবের পেছনে মূলত আগের দিনের একটি সরকারি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভুল ব্যাখ্যা ও অতিরঞ্জন কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রোববার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একটি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল অভিযুক্তরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দাবি করা হয়, তাদের সহায়তা করার অভিযোগে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তবে এই দাবি প্রকাশের পরপরই তা নাকচ করে দেয় মেঘালয় পুলিশ এবং ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। মেঘালয় পুলিশের মহাপরিচালক ইদাশিশা নংগ্রাং-এর একটি বিবৃতি উদ্ধৃত করে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, পলাতক খুনিদের সহায়তার অভিযোগে ওয়েস্ট গারো হিলস জেলায় দুজনকে গ্রেপ্তারের যে খবর বাংলাদেশ থেকে প্রচার করা হয়েছে, তার কোনো “ভিত্তি নেই”।
এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেয় বিএসএফ। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বিএসএফের মেঘালয় সীমান্ত অঞ্চলের ইন্সপেক্টর জেনারেল ওম প্রকাশ উপাধ্যায় বলেন, “মেঘালয়ের হালুয়াঘাট দিয়ে কোনো ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে—এমন কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।” তার এই বক্তব্য সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর দাবিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অস্বীকৃতির পরও রোববার রাতে ঢাকার পুলিশ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সীমান্ত এলাকার নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তারা ওই দাবি করেছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নাম, স্থান বা গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডটি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ও সংবেদনশীল একটি ঘটনা। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। তার হত্যার পর থেকেই দ্রুত বিচার এবং প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। এই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত পেরিয়ে পালানো এবং বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার মতো খবর সাধারণ মানুষের আবেগ ও কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, মেঘালয় পুলিশ ও বিএসএফের পরপর অস্বীকৃতির ফলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা কতটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনায় দুই দেশের সরকারি সংস্থার সমন্বয় ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার বা অভিযানের খবর প্রকাশ পাওয়া সাধারণত কঠিন—এ বিষয়টিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের গুজব শুধু তদন্ত প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করে না, বরং দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির পরিবেশও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন বিষয়টি একটি আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তখন তথ্যের নির্ভুলতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।
বর্তমানে পর্যন্ত ভারতের কোনো রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকেই ওসমান হাদির হত্যাকারীদের সহায়তার অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তারের আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সরাসরি এই গুজবকে ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা দিয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দাবিগুলোর বিপরীতে একটি স্পষ্ট বার্তা।
সব মিলিয়ে, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশসহ ভারতের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সাম্প্রতিক অবস্থান এক বিষয় স্পষ্ট করেছে—সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো গ্রেপ্তারের খবর বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখন নজর থাকবে বাংলাদেশের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কীভাবে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়, সে দিকেই।