প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এই শোকের আবহে শোক প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাস পেরিয়ে শেখ হাসিনার এই শোকবার্তা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করছেন। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে খালেদা জিয়ার অবদান অপরিসীম। শেখ হাসিনা তার শোকবার্তায় বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বে এক অপূরণীয় ক্ষতি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানসহ শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, মহান আল্লাহ যেন পরিবার ও বিএনপির নেতাকর্মীদের এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দান করেন।
এই শোকবার্তাটি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের রাজনীতিতে বিভাজন ও উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরেই প্রকট। দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আন্দোলন–সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার এই শোক প্রকাশ অনেকের কাছে মানবিক ও রাজনৈতিক পরিণতিবোধের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে। সকাল ৯টায় এভারকেয়ার হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া যে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রুহুল কবির রিজভী তার শোকবার্তায় উল্লেখ করেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার সাহসী নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে এ দেশের মানুষকে পথ দেখিয়েছে। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন এবং নানা চড়াই–উৎরাই পার করেছেন, কিন্তু নিজের রাজনৈতিক আদর্শ ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শুধু বিএনপি নয়, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও শোক প্রকাশ করেছেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার শোকবার্তায় বলেন, দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর অবদান ও সংগ্রামের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, আজ তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর পরিবার ও সহকর্মীদের জন্য সবরে জামিল কামনা করেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করা মাহফুজ আলমও শোক প্রকাশ করে বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়া ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা ঘটনাপ্রবাহে পূর্ণ। তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুইবার সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনে অংশ নেয়। গণতন্ত্র, সংসদীয় ব্যবস্থা এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ় অবস্থানে। রাজনৈতিক মতভেদ ও দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শেখ হাসিনার শোকবার্তা সেই বাস্তবতাকেই যেন নতুন করে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এবং একজন সহকর্মী রাজনীতিবিদ হিসেবে খালেদা জিয়ার অবদানকে স্বীকার করে নেওয়ার এই বার্তা দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকছে। অনেকের মতে, এই শোকবার্তা বিভক্ত রাজনীতির মাঝে অন্তত মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
এই সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যাচাই করে এবং অনলাইন তথ্য–উপাত্ত বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে মানবিক ও পাঠক–আকর্ষণীয় উপস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে যে শোক ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা ইতিহাসের পাতায় বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে স্থান করে নেবে। শেখ হাসিনার শোকবার্তাও সেই ইতিহাসেরই একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।