প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মিয়ানমারের প্রথম ধাপের জাতীয় নির্বাচনে জয় দাবি করেছে দেশটির জান্তা সমর্থিত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। তবে ভোটের পরিবেশ ও বাস্তবতায় সংখ্যালঘু নাগরিকরা বলছেন, তারা শুধুমাত্র ভয় ও বাধ্যবাধকতায় ভোট দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক নয় বলে সমালোচনা করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসলে এই নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং সামরিক শাসনের নতুন মুখ প্রদর্শনের জন্য আয়োজন করা হয়েছে।
২০২১ সালে মিয়ানমারে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক জান্তা। প্রায় চার বছর পর এই সরকারই দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছে। প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় গত শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) থেকে রবিবার (২৯ ডিসেম্বর) পর্যন্ত। নির্বাচনের দিন সকালেই রাজধানী নেপিদোতে ভোট দেন জান্তার প্রধান মিন অং হ্লাইং। ভোট কেন্দ্র থেকে জনগণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তিনি গণতন্ত্রের কথাও বলেন। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, তার ভাষণে গণতন্ত্রকে শুধু শোভাময় দেখানো হয়েছে।
ভোট শুরুর প্রথম দিন থেকেই জান্তা সমর্থিত ইউএসডিপি দাবি করেছে, তারা বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু ইয়াঙ্গুন, মান্দালয়সহ বড় শহরগুলোতে সাধারণ পরিবেশ ছিল বিপরীত; ফাঁকা রাস্তাঘাট, বন্ধ দোকানপাট এবং ভোটকেন্দ্রে শূন্যের মতো উপস্থিতি ছিল নাগরিকদের। অধিকাংশ ভোটার বন্দুকের ভয়ে ভোট দিতে বাধ্য হন। মান্দালয়ের ভোটের আগের রাতে প্রতিরোধ গোষ্ঠীর রকেট হামলার পর নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হয়। সেনা, পুলিশ ও সাদাপোশাক বাহিনী ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অবস্থান নেন, এবং অনেকেই শুধু নজরদারি ও হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য ভোট দিতে বাধ্য হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, নির্বাচনের শুরু থেকেই এটি বাছাই করা হয়েছিল। নতুন নির্বাচনী ব্যবস্থাও ইউএসডিপির পক্ষে সুবিধাজনকভাবে সাজানো হয়েছে। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী, সেনাবাহিনী সংসদের ২৫ শতাংশ আসন পায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। নির্বাচনের মাধ্যমে আসা আসন যোগ হলে, যদিও বেসামরিক সরকার গঠন হয়, ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে সেনাদের হাতেই।
চীন, রাশিয়া, বেলারুশসহ কয়েকটি দেশ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দেশগুলোর সমর্থন জান্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব দেশ জান্তাকে অস্ত্র, ড্রোন ও বিমান সরবরাহ করে, তাদের স্বীকৃতিই এখন জান্তার জন্য সবচেয়ে বড় বৈধতা।
নির্বাচনের লক্ষ্য বিশেষজ্ঞদের মতে একটাই—মিন অং হ্লাইংকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট বানানো। এরপর জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা প্রাপ্তির ছদ্ম মোড়ক তৈরি করা হবে। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের ভয়ভীতি সবই ইঙ্গিত দেয়, যে ভোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সামরিক শাসনের দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করা।
ভোটকেন্দ্রের বাইরে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই নির্বাচনী পরিবেশে স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ ছিল না। ভয়, হুমকি, নজরদারি ও সম্ভাব্য গ্রেফতারের কারণে ভোটাররা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন। সন্ত্রাসের ছাপ এবং সেনা বাহিনীর চাপ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক জান্তা চাইছে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি বৈধ মুখের পরিচয় তৈরি করতে। তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ ও গণতন্ত্রপন্থি নেতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা ভুয়া। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, তবে বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মিয়ানমারের এই নির্বাচন প্রমাণ করছে যে, নির্বাচনের নামের আড়ালে সামরিক শাসন ও প্রভাব বিস্তার, ভোটের প্রক্রিয়াকে জনগণের জন্য স্বচ্ছ ও স্বাধীন করা যায়নি। দেশের নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলেও তারা বেছে নিয়েছেন না নিজের ইচ্ছা, বরং ভয় ও বাধ্যবাধকতার কারণে।
মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামরিক শাসনের প্রভাব আগামী দিনগুলোতে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও রিপোর্টের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ভোটের নাটক ও জান্তাপন্থি দলের জয় দাবি দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে।