ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিল সংযুক্ত আরব আমিরাত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জর্জরিত ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক মোড় দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অন্যতম প্রধান শরিক সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দেশটি থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান উত্তেজনা, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সাম্প্রতিক বিমান হামলা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কড়া অবস্থানের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আবুধাবি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এই ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মঙ্গলবার আল জাজিরার খবরে জানানো হয়, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এর আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউএই তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে। এতে করে ইয়েমেন সংঘাতে সৌদি জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং মিত্রদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এবং সন্ত্রাসবিরোধী মিশনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইয়েমেনে অবস্থানরত অবশিষ্ট সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলোকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় আমিরাতি সেনাদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা হবে।

ইয়েমেন সরকার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও এর পেছনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। মঙ্গলবারই ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেন। একই সঙ্গে তিনি ইউএই বাহিনীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন ত্যাগের নির্দেশ দেন। পরিস্থিতির গুরুতরতা বিবেচনায় তিনি ৯০ দিনের জন্য দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং সব বন্দর ও স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান ৭২ ঘণ্টার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এসব পদক্ষেপ ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ইউএইর সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা। মঙ্গলবার ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ‘সীমিত’ বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় ইয়েমেনের মুখাল্লা বন্দরে ইউএই–সম্পৃক্ত দুটি জাহাজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সৌদি প্রেস এজেন্সিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জোট বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে আসা ওই দুটি জাহাজ ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কমান্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই মুখাল্লা বন্দরে প্রবেশ করেছিল। জোটের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অননুমোদিত প্রবেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।

ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, ওই জাহাজগুলোর মাধ্যমে দক্ষিণ ইয়েমেনে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছে অস্ত্র পাঠানো হয়েছিল। এই কাউন্সিলটি দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে সক্রিয় এবং সৌদি-সমর্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত বৈরী। ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের মতে, ইউএইর এই ধরনের তৎপরতা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা বরাবরই বহুমাত্রিক। একদিকে তারা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, অন্যদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনে কিছু স্থানীয় শক্তিকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সঙ্গে ইউএইর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচিত। এই দ্বৈত অবস্থান ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ককে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে।

সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাকে কেউ কেউ ইউএইর কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমিরাত সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ হতে পারে। তবে অন্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইয়েমেন সরকারের কড়া অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার চাপও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

ইয়েমেনের সাধারণ জনগণের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামাজিক কাঠামোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই অবস্থায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা মানবিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

আন্তর্জাতিক মহলও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ ইয়েমেনে শান্তি প্রক্রিয়া জোরদারের আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইউএইর সেনা প্রত্যাহার একদিকে সংঘাত কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করে নতুন সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে—এমন দ্বিমুখী আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কূটনীতিকেরা।

সব মিলিয়ে, ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেশটির চলমান সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমীকরণ, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের জন্য এই পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন অনিশ্চয়তাও বয়ে আনছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত