খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসছেন ছয় দেশের প্রতিনিধি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৬ বার
খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্বের ছয়টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসছেন। দক্ষিণ এশিয়া ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী এসব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের আগমন কেবল একটি শোকানুষ্ঠান নয়, বরং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল থেকেই একে একে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে বিদেশি প্রতিনিধিদের। এর মধ্যে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত এবং ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সকালে ঢাকায় আসবেন। এরপর দুপুর পৌনে বারোটায় নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দুপুর ১২টায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এবং দুপুর ১টার দিকে শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমনের কথা রয়েছে। এই প্রতিনিধিরা বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। ভুটানের পক্ষ থেকে উপস্থিত থাকবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি. এন. ধুঙ্গেল। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে আসছেন দেশটির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী ড. আলি হায়দার আহমেদ। নেপাল ও শ্রীলংকার প্রতিনিধিরাও নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে শোকবার্তা বহন করে আনবেন বলে জানা গেছে।

কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কের মানবিক দিকটি তুলে ধরছে। বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি পরিচিত মুখ। তাঁর শাসনামলে আঞ্চলিক সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলে তাঁর মৃত্যুতে প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের ঢাকায় আসা স্বাভাবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার এসব বিদেশি মিশন তাদের নিজ নিজ ফেসবুক পেজ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে সমবেদনা জানায়। তারা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অবদান স্মরণ করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই প্রতিক্রিয়াগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচিতিরই প্রমাণ।

সরকারের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর এবং ১ ও ২ জানুয়ারি—এই তিন দিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি বুধবার সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে শোক পালন ও জানাজায় অংশ নিতে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। বিএনপি নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হাসপাতালে ও পরে তাঁর বাসভবনের সামনে ভিড় জমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকবার্তা ও স্মৃতিচারণায় ভরে ওঠে টাইমলাইন।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বুধবার দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বাদ জোহর একই সময়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়েও জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজার জন্য খালেদা জিয়ার কফিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে রাখা হবে। সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ জানাজার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের কথা বিবেচনায় রেখে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিনিধিদের আগমনকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার জানাজায় বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল মুহূর্ত তৈরি করবে। সাধারণত রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছাড়া এমন উচ্চপর্যায়ের বিদেশি উপস্থিতি খুব কমই দেখা যায়। এটি একদিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তুলে ধরছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের গভীরতাও প্রকাশ করছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, এই শোকের মুহূর্তে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মরহুম নেত্রীর প্রতি সম্মান জানানো উচিত। তাদের মতে, খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি বড় অধ্যায়। তাঁর জীবনের শেষ বিদায়ে দেশি-বিদেশি মানুষের অংশগ্রহণ সেই ইতিহাসেরই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ছয় দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের ঢাকায় আগমন সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় শোক, সাধারণ ছুটি, আন্তর্জাতিক সমবেদনা এবং বিপুল জনসমাগম—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সময়টি একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত