প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিনেই বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মহানগর নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বের ভার নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি। শপথ গ্রহণের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন এই তরুণ নেতা। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, তার জনপ্রিয়তাও যেন তত দ্রুতগতিতে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, মামদানির জনপ্রিয়তা বাড়ছে রকেট গতিতে—এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা অতীতে নিউইয়র্ক সিটির কোনো নবনির্বাচিত মেয়রের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে মামদানির প্রতি জনসমর্থন ছিল মাত্র ১৪ পয়েন্ট, সেখান থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ পয়েন্টে। অর্থাৎ মাত্র অল্প সময়ের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে ২৪ পয়েন্ট। নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এর আগে কখনোই কোনো মেয়র শপথ গ্রহণের আগে এমন ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে দায়িত্ব নিতে যাননি। শুধু শহরের মধ্যেই নয়, নিউইয়র্ক রাজ্যজুড়েও মামদানির প্রতি সমর্থন ১৫ পয়েন্টের বেশি, যা একটি রেকর্ড হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
নববর্ষের দিনে নিউইয়র্ক সিটির সিটি হলে অনুষ্ঠিত হবে তার শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা। জনসমক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মামদানিকে পরিচয় করিয়ে দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম মুখ, ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বামপন্থি রাজনীতির আইকন হিসেবে পরিচিত ভার্মন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। আর তাকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস। এই উপস্থিতিগুলোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, মামদানির নেতৃত্ব কেবল একটি সিটি প্রশাসনের বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
জোহরান মামদানির উত্থানকে অনেকেই দেখছেন মার্কিন রাজনীতিতে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে। দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ও মুসলমান পরিচয় নিয়ে তিনি এমন এক শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, যা অভিবাসী সংস্কৃতির কেন্দ্র হলেও শীর্ষ নেতৃত্বে এ ধরনের প্রতিনিধিত্ব আগে দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মুসলমান ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি নিউইয়র্ক সিটির মতো বৃহৎ নগরের মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মামদানির জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ভাষা। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে কেন্দ্র করে তিনি যে প্রচারণা চালান, তা নিউইয়র্কবাসীর বড় একটি অংশের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি নিউইয়র্কে বাসাভাড়া, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামদানি এই বাস্তবতাকেই সামনে এনে নিজেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
তার অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি হলো নিউইয়র্ক সিটির গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়া। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, শহরের বাসব্যবস্থা হবে দ্রুতগতির এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যের। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিলিয়নেয়ার ও মিলিয়নেয়ারদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের কথা বলেছেন। জরিপ অনুযায়ী, তার এই পরিকল্পনার পক্ষে রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ জনসমর্থন, যেখানে বিরোধিতা করছেন ৪১ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ, বিতর্ক থাকলেও প্রস্তাবটি ইতোমধ্যেই শহরের রাজনৈতিক আলোচনায় কেন্দ্রে চলে এসেছে।
৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মামদানির বিজয় ছিল নিরঙ্কুশ। তিনি সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রিও কুওমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। এই ফলাফল শুধু ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং নিউইয়র্কের ভোটারদের রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মুখগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে তারা একজন তরুণ, প্রগতিশীল ও তুলনামূলকভাবে নতুন নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছেন।
৩৪ বছর বয়সে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মামদানি, যা তাকে গত একশ বছরের মধ্যে শহরটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়রে পরিণত করেছে। তার বয়স, পরিচয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান—এই তিনটি বিষয়ই তাকে আলাদা করে তুলেছে। তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ তাকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উপস্থিতি, সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস এবং স্পষ্ট ভাষায় নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করার দক্ষতা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মামদানির জনপ্রিয়তা কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ফল নয়; এটি সময়ের চাহিদারও প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা বৈষম্য, আবাসন সংকট এবং মধ্যবিত্তের ওপর অর্থনৈতিক চাপ—এসব ইস্যুতে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে সরাসরি সমাধানের কথা বলছেন তিনি। ফলে অনেক ভোটারই তার মধ্যে পরিবর্তনের আশার প্রতিচ্ছবি দেখছেন।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নিউইয়র্ক সিটির মতো বিশাল ও জটিল নগর পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। বাজেট ঘাটতি, আবাসন সংকট, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সবকিছুই তার সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। বিলিয়নেয়ারদের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও আইনি বাধাও আসতে পারে। তবু সমর্থকেরা মনে করছেন, শক্ত জনসমর্থন ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান তাকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
নিউইয়র্কের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও মামদানির উত্থান নজরে পড়েছে। প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থকেরা তাকে ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতির সম্ভাব্য মুখ হিসেবেও দেখছেন। তার শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান ঘিরে যে উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত দেয়—নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব শুরু হলেও তার রাজনৈতিক প্রভাব হয়তো শহরের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে বিস্তৃত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জোহরান মামদানি এখন কেবল নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এক নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতীক। রকেট গতিতে বাড়তে থাকা তার জনপ্রিয়তা প্রমাণ করছে, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলে বয়স, পরিচয় কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক ছক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। নববর্ষের প্রথম দিনে তার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক যেমন এক নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিও হয়তো দেখতে যাচ্ছে এক নতুন দিগন্তের সূচনা।