প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে ফের উত্তেজনা ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মধ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর, পাল্টা জবাবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, তার দেশও একই হারে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করতে বাধ্য হবে। দুই দেশের এই ঘন ঘন পাল্টা অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
ব্রাজিলের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান শুক্রবার জানায়, প্রেসিডেন্ট লুলা তাঁর বক্তব্যে বলেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসায়, তাহলে আমরাও তাদের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসাবো। এটা প্রতিক্রিয়ার নয়, ন্যায্যতার প্রশ্ন।” তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে ব্রাজিল কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কাছে নতিস্বীকার করতে রাজি নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অভিপ্রায়। ট্রাম্প সম্প্রতি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়াকে ‘উইচ-হান্ট’ বা ‘ডাইনি শিকার’ আখ্যা দিয়ে এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, বলসোনারোর প্রতি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সহানুভূতির কারণেই এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়েছে।
এমন ঘোষণার পরই গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে লুলা তার মন্ত্রিসভা নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার জবাবে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে করণীয় নির্ধারণে একটি স্টাডি গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই গ্রুপ দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে কাজ শুরু করবে। সেই সঙ্গে ব্রাজিল সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এর কাছে অভিযোগ জানিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পও অবস্থানে অনড় থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তাহলে সেই শুল্কের হার আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তার প্রশাসন এমনকি বাংলাদেশ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ একাধিক দেশকে সম্প্রতি নতুন শুল্কের বিষয়ে প্রাথমিক চিঠি পাঠিয়েছে। চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে আগামী ১ আগস্ট থেকেই নতুন শুল্ক হার কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়েছে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থা যেখানে সহযোগিতামূলক মনোভাবের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়ামূলক নীতির ফলে ভবিষ্যতে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ব্রাজিল-যুক্তরাষ্ট্র এই বাণিজ্য উত্তেজনা কেবল দুই দেশের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলবে না, বরং এর ঢেউ আছড়ে পড়বে বৈশ্বিক বাজারে এবং উৎপাদক ও আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতেও।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্বিপাক্ষিক সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মনীতি মেনে চলার মাধ্যমেই কেবল এই উত্তেজনা প্রশমিত করা সম্ভব। না হলে এই বাণিজ্য যুদ্ধ এক সময় বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যার দায়ভার বহন করতে হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ বিশ্ব অর্থনীতির সব পক্ষকেই।