প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও কূটনৈতিক সৌজন্যের এক ব্যতিক্রমী মুহূর্তের সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে, যা শুধু শোকবার্তা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বুধবার ৩১ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। তাঁর সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো। ঢাকায় পৌঁছানোর পরপরই তিনি খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
এই সাক্ষাতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে পাঠানো একটি ব্যক্তিগত চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেওয়া। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নয়, বরং একজন সন্তান হিসেবে মায়ের শোকে নিমজ্জিত তারেক রহমানের কাছে এই চিঠি হস্তান্তর করা হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চিঠিটিতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক জীবন, অবদান এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
সাক্ষাতের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের সরকার ও জনগণ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তিনি উল্লেখ করেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্ব, আদর্শ ও মূল্যবোধ ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে—এমন প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন জয়শঙ্কর।
তারেক রহমান এই শোকবার্তা গ্রহণ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁর মা সবসময় আঞ্চলিক শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন। এই ধরনের সহমর্মিতা ও মানবিক কূটনৈতিক আচরণ দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই সাক্ষাৎকে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। অতীতের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও শোকের মুহূর্তে এমন সরাসরি যোগাযোগকে তারা একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তরের ঘটনা কেবল আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ নয়, বরং ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের একটি নরম ও মানবিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বহু বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা উত্থান-পতন দেখা গেছে। কখনো সহযোগিতা, কখনো মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের পক্ষ থেকে এমন উচ্চপর্যায়ের শোকবার্তা এবং ব্যক্তিগত চিঠি পাঠানোকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, বিদেশি কূটনীতিক ও সাধারণ মানুষ নানা উপায়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। এই পরিচয় তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন, সাফল্য ও বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর এবং নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তরের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের এমন সরাসরি যোগাযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে বলে মত অনেকের।
শোকের এই সময়ে রাজনীতি অনেকটাই নীরব থাকলেও, কূটনৈতিক ভাষা ও ইঙ্গিতগুলো বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও শেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি যুগের অবসান ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলবে আরও দীর্ঘদিন।
ঢাকায় এই সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর জানান, শোকের এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়ানো ভারতের জন্য সম্মানের। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সরকারে সরকারে নয়, জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল। এই মানবিক যোগাযোগ সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, শোক, সৌজন্য ও কূটনীতির সংমিশ্রণে গড়া এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হয়ে থাকল। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ের মধ্য দিয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এমন আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা দেশবাসীর কাছেও এক ভিন্ন মাত্রার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।