৭ বছর কোমার লড়াই শেষে না–ফেরার দেশে আকশু ফার্নান্দো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার আকশু ফার্নান্দো

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ সাত বছর ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন শ্রীলঙ্কার প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার আকশু ফার্নান্দো। একসময় যাকে ঘিরে ছিল স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর ভবিষ্যতের আলো, সেই তরুণ ক্রিকেটারের জীবন থেমে গেল কোমার নিঃশব্দ অন্ধকারে। মঙ্গলবার ৩৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাবেক এই ক্রিকেটার। তার মৃত্যুতে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।

২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। দিনটি আকশু ফার্নান্দোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল চিরতরে। সেদিন নিয়মিত অনুশীলনের অংশ হিসেবে রানিং সেশন শেষ করে মাউন্ট লাভিনিয়া সৈকত এলাকায় হাঁটছিলেন তিনি। হঠাৎই একটি ট্রেন তাকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সবকিছু। গুরুতর মাথার আঘাত পান আকশু, শরীরের বিভিন্ন হাড় ভেঙে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিনই চিকিৎসকরা তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখেন। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর লড়াই—যে লড়াইয়ে আকশু নিজে কখনো সচেতন ছিলেন না, কিন্তু তার পরিবার, বন্ধু আর ক্রিকেটাঙ্গন প্রতিদিন নতুন করে আশা বুনে গেছেন।

সাত বছর ধরে কোমায় ছিলেন আকশু ফার্নান্দো। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তার পরিবার হাসপাতালের করিডরে, আইসিইউর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করেছে একটি অলৌকিক ঘটনার। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমা ছাড়িয়ে হয়তো একদিন আকশু চোখ খুলবেন, আবার হাঁটবেন, আবার ব্যাট হাতে মাঠে নামবেন—এই আশাই বাঁচিয়ে রেখেছিল তাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হলো মঙ্গলবার, যখন চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

আকশু ফার্নান্দো ছিলেন শ্রীলঙ্কার ২০১০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের সদস্য। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটার ও কার্যকর অলরাউন্ডার। স্কুল ক্রিকেট এবং ক্লাব পর্যায়ে তার পারফরম্যান্স তাকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নিয়ে আসে খুব অল্প বয়সেই। ২০১০ যুব বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার করা গুরুত্বপূর্ণ ৫২ রান আজও অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যদিও সেই ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার বিদায় ঘটে, তবু আকশুর ইনিংস ছিল চাপের মুখে সাহসী ব্যাটিংয়ের এক উদাহরণ। ওই টুর্নামেন্টে ছয় ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল ১৩৬ রান, যা তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারদের তালিকায় জায়গা করে দেয়।

অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় পেরিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিজের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছিলেন আকশু। রাগামা ক্লাবের হয়ে তিনি নিয়মিত খেলেছেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত করার পথে ছিলেন। তার ব্যাটিংয়ে ছিল দৃঢ়তা, আর মাঠে ছিল ভদ্র ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ—যা তাকে সতীর্থদের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল।

২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর, দুর্ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, আকশু খেলেছিলেন তার শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। সেই ম্যাচে তিনি শূন্য রানে আউট হন এবং বল হাতেও কোনো উইকেট পাননি। তবে ক্রিকেট যেমন অনিশ্চয়তার খেলা, তেমনি আকশুর ক্যারিয়ারও কেবল একটি ম্যাচে বিচার করার মতো ছিল না। তার আগের ম্যাচেই তিনি এক ইনিংসে অপরাজিত ১০২ রান করেছিলেন, যা প্রমাণ করে তার ব্যাটে তখনো আগুন ছিল। কেউই কল্পনা করতে পারেনি, সেটিই হবে তার ক্যারিয়ারের শেষ উজ্জ্বল অধ্যায়।

দুর্ঘটনার পর থেকে আকশুর জীবন আর কখনো আগের পথে ফেরেনি। হাসপাতালের বিছানায় নিথর দেহ, যন্ত্রের শব্দ, মনিটরের ওঠানামা—এই ছিল তার সাত বছরের বাস্তবতা। পরিবার এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েনি। চিকিৎসা, প্রার্থনা আর ভালোবাসার মেলবন্ধনে তারা বিশ্বাস করেছিল, হয়তো একদিন আকশু আবার তাদের ডাকে সাড়া দেবে। কিন্তু নিয়তি ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিল।

আকশুর মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত ধারাভাষ্যকার রোশান আবিসিংহে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি আকশুকে স্মরণ করে বলেন, মাত্রই দুঃখজনক খবরটি শুনলাম। আকশু ফার্নান্দো মারা গেছে। সে সত্যিই একজন অসাধারণ যুবক ছিল, যার প্রতিশ্রুতিশীল ক্যারিয়ার এক নিষ্ঠুর দুর্ঘটনার কারণে শেষ হয়ে যায়। সে তার স্কুল এবং ক্লাব রাগামার একজন ভালো খেলোয়াড় ছিল। যারা তাকে জানতাম, আমাদের সবার জন্য এটি একটি গভীর শোকের দিন। সে ছিল হাসিখুশি, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং একজন ভদ্রলোক। আমরা আকশুকে মিস করব।

এই বক্তব্যেই যেন ধরা পড়ে আকশুর ব্যক্তিত্বের পূর্ণ চিত্র। কেবল একজন ক্রিকেটার হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। মাঠের বাইরে তার আচরণ, সহানুভূতি ও বিনয় তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে। সতীর্থদের অনেকেই জানিয়েছেন, আকশু সবসময় তরুণ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতেন, সিনিয়রদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং দলগত সাফল্যকে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

তার মৃত্যু আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, খেলোয়াড়দের জীবন কতটা অনিশ্চিত। একটি মুহূর্ত, একটি দুর্ঘটনা, পুরো জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। ক্রিকেট মাঠে দর্শকদের করতালি, সংবাদ শিরোনাম আর পরিসংখ্যানের আড়ালে যে মানুষগুলো লড়াই করে, তাদের জীবনও যে ভঙ্গুর—আকশু ফার্নান্দোর গল্প সেটিই মনে করিয়ে দেয়।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড এবং বিভিন্ন ক্লাব থেকেও শোকবার্তা আসতে শুরু করেছে। অনেকেই দাবি করছেন, আকশুর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে কোনো স্মরণসভা বা বিশেষ আয়োজন করা হোক। কারণ আকশু হয়তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেননি, কিন্তু তার সম্ভাবনা, সংগ্রাম আর অসমাপ্ত স্বপ্ন তাকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট ইতিহাসে এক বেদনাময় নাম করে রেখেছে।

সাত বছরের কোমা শেষে আকশু ফার্নান্দোর এই বিদায় শুধু একটি জীবনের শেষ নয়, এটি অসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু। যে তরুণ ব্যাট হাতে দেশের জন্য লড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি আজ স্মৃতির পাতায়। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট তার এক নীরব যোদ্ধাকে হারাল, আর ক্রিকেটবিশ্ব হারাল একটি অসম্পূর্ণ গল্প—যা হয়তো আরও অনেক দূর যেতে পারত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত